শিরোনাম

উপকূলের অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: ঝুঁকির মাঝেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

 প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন   |   মতামত

উপকূলের অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: ঝুঁকির মাঝেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

রবিউল আলম মুন্না :

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান দুর্যোগ, লবণাক্ততা ও জীবিকা সংকট—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে এই ঝুঁকির মধ্যেই আশার আলো দেখাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োগের মাধ্যমে এআই উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।


প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অর্থনীতির রূপান্তর : 


বিশ্বজুড়ে এআই এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, বরং বর্তমান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ব্যাংকিং, শিল্প, কৃষি, ব্যবসা—সবখানেই এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং ঝুঁকি কমছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন, গ্রাহকসেবা, বাজার বিশ্লেষণ ও উৎপাদন পূর্বাভাসে এআই ইতোমধ্যে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।


 

উপকূলীয় অর্থনীতির বাস্তবতা : খুলনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল দেশের কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই অঞ্চলে বসবাস করে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মৎস্য খাতে ক্ষতি বাড়ছে এবং মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ফলে উপকূলীয় অর্থনীতিকে টেকসই করতে নতুন চিন্তা ও প্রযুক্তির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।


কৃষি ও মৎস্য খাতে এআই-এর সম্ভাবনা : 

এআই ভিত্তিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পূর্বাভাস উপকূলীয় কৃষিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আগাম তথ্যের মাধ্যমে কৃষকরা কখন ফসল রোপণ করবেন বা কখন কাটবেন—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। মৎস্য ও চিংড়ি চাষে পানির গুণগত মান বিশ্লেষণ, রোগ শনাক্তকরণ এবং উৎপাদন পূর্বাভাসে এআই ব্যবহার করলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ভূমিকা :  উপকূলীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আগাম সতর্কতা দিতে পারে, ফলে জানমাল ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ কার্যক্রম গ্রহণ সহজ হবে।


পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসায় নতুন সুযোগ : কক্সবাজার, কুয়াকাটা কিংবা সুন্দরবন—এই পর্যটনকেন্দ্রগুলো উপকূলীয় অর্থনীতির বড় অংশ। এআই ব্যবহার করে পর্যটক প্রবাহ, মৌসুমি চাহিদা ও আয় বিশ্লেষণ করা গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা আরও কার্যকর পরিকল্পনা নিতে পারবেন। এতে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


চ্যালেঞ্জও কম নয় : তবে বাস্তবতা হলো—উপকূলীয় অঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও ডেটার মান উন্নয়নও বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধান ছাড়া এআই-এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন।

 

বিশেষজ্ঞদের মত : প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলীয় অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আলাদা এআই-ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। সরকারি–বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ালে এই প্রযুক্তি বাস্তব সুফল দিতে পারে।


সম্ভাবনার পথে উপসংহার : বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অন্যদিকে সম্ভাবনাময়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। সময়োপযোগী নীতি, বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এআই যদি উপকূলীয় অর্থনীতিতে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে তা শুধু এই অঞ্চলের নয়—পুরো দেশের অর্থনীতির জন্যই একটি বড় অর্জন হবে।