শিরোনাম

মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: পরিকল্পিত গণহত্যা ও স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা

 প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫৬ অপরাহ্ন   |   মতামত

মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: পরিকল্পিত গণহত্যা ও স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা

মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ও অন্ধকার অধ্যায়; যা কেবল তাৎক্ষণিক নৃশংসতা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত গণহত্যা। এই হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল সদ্য জন্ম নিতে যাওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে দেওয়া, যাতে স্বাধীনতার পরপরই দেশটি নেতৃত্ব, চিন্তা ও দিক-নির্দেশনার সংকটে পড়ে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এই পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায়, যদিও এর বীজ বপন করা হয়েছিল অনেক আগেই।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী শক্তি; বিশেষত জামায়াতে ইসলামী ঘনিষ্ঠ আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী; মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে সামরিকভাবে পরাজয় অনিবার্য। ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণ এবং মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। 

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সাধনের পরিকল্পনা নেয়। সামরিক পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বেছে নেওয়া হয় দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের; যাঁরা ছিলেন শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী সহ বিভিন্ন পেশার সাথে সংযুক্ত।

এই হত্যাকাণ্ড হঠাৎ কোন আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি ছিল তথ্যভিত্তিক, তালিকাভুক্ত ও সংগঠিত ঘটনা। বিভিন্ন গবেষণা, স্মৃতিচারণা ও সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের দোসররা যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকা অফিস ও পেশাজীবী সংগঠনের ওপর নজরদারি চালায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, সাংবাদিক মহলের প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর এবং চিকিৎসা পেশার নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা এই তালিকায় ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বরের আগের কয়েক দিনে পরিকল্পিতভাবে তাঁদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমি এই হত্যাযজ্ঞের প্রতীকী স্থান হয়ে উঠেছে। চোখ বাঁধা অবস্থায় নির্যাতনের পর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়, অনেকের লাশে পাওয়া গেছে নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন। এই পদ্ধতিগত নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করে যে এটি ছিল গণহত্যার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় বা আধা-রাষ্ট্রীয় শক্তির সহায়তায় নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা। এখানে “গোষ্ঠী” বলতে জাতিগত নয়, বরং বৌদ্ধিক ও পেশাগত পরিচয়কে লক্ষ্য করা হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। স্বাধীনতার মাত্র দুই দিন আগে দেশের মেধাবী মানুষদের হত্যা করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল; বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তা হবে দুর্বল, দিকহীন ও অচল। তারা ভেবেছিল, নেতৃত্ব ও চিন্তার স্তম্ভগুলো ভেঙে দিলে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ব্যাহত হবে। আংশিকভাবে এই ক্ষতি বাস্তবেও প্রতিফলিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গবেষণা খাতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা পূরণ করতে দশকের পর দশক লেগেছে।

তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো; এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জাতীয় চেতনায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা আরও উজ্জ্বল করে তোলে। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তির প্রতীক। তাঁদের রক্তে লেখা এই ইতিহাস বাঙালিকে শিখিয়েছে যে স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের বিষয় নয়; এটি জ্ঞান, বিবেক ও মানবিকতার সংগ্রাম। প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের মধ্য দিয়ে জাতি এই সত্যকে পুনরুচ্চারিত করে।

গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডকে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার বৃহত্তর কাঠামোর বাইরে রাখা যায় না। এটি ২৫ মার্চের কালরাত্রি, গ্রামবাংলার নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং শরণার্থী সংকটের ধারাবাহিক অংশ। আন্তর্জাতিক পরিসরে গণহত্যা স্বীকৃতির আলোচনায় এই অধ্যায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এটি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানি বাহিনীর লক্ষ্য ছিল কেবল সামরিক দমন নয়, বরং একটি জাতির সামাজিক ও বৌদ্ধিক কাঠামো ধ্বংস করা।

সবশেষে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি নীলনকশা ভিত্তিক অপরাধ; যার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্য থেকেই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দীপ্ত আলোর জন্ম হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ জাতিকে শিখিয়েছে, মেধা ও বিবেককে হত্যা করা যায়, কিন্তু একটি জাতির চিন্তাকে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না।


লেখক: ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।