বীমা খাত নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় : একটি সার্কুলার ও তার পরিনতি
সরকার ও তার বিভিন্ন দফতর অনেক সময় দেশের ভালোর জন্যে অনেকরকম সার্কুলার, প্রজ্ঞাপন বা নীতি নির্ধারনী বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। কিছু কিছু সময় এ সকল সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপনগুলো কল্যাণকর হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কিছু সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপন কল্যানকর তো দূরের কথা রীতিমত বুমেরাং বা তাৎক্ষণিক ও সুদুরপ্রসারি নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করে, যা দেশ ও তার অর্থনীতির জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তেমনি একটি সার্কুলারের কথাই আজ আমাদের আলোচ্য। দেশের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা (পূর্ববর্তী সময়ে) ‘ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ - ওউজঅ)’র কিছু ভূমিকা স্ববিরোধী এবং পেশাদার বিচক্ষণতার অভাবযুক্ত ছিল, যা উদ্বেগের জন্ম দেয়। যেমন বিগত ২১ ডিসেম্বর ২০২০-এর নন-লাইফ ৮২/২০২০ সার্কুলারটি তা একটি স্পষ্ট উদাহরণ। কারণ এই সার্কুলারে প্রথম প্যারাতেই বলা আছে ‘দেশের জিডিপিতে বীমা খাতের পেনিট্রেশন বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে বীমা খাতকে প্রবৃদ্ধির খাত (এৎড়ঃিয ঝবপঃড়ৎ) হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা, বীমা খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও বীমা পলিসি গ্রাহকগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার নিমিত্ত নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য এই সার্কুলার জারী করা হলোঃ..........’ এই সার্কুলারটি জারী হয় ২১ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে যখন দেশের জিডিপিতে বীমা শিল্পের অবদান ছিল ০.২৯% যা অতি নগন্য, সেবাখাতে দেশের জিডিপিতে এর চাইতে কম অবদান কারো আছে কিনা তা খুঁজে দেখার বিষয়। সার্কুলার ইস্যু হওয়ার সময় জিডিপিতে যেখানে ০.২৯% ছিল সেখানে এই অবদান কমতে কমতে সর্বশেষ ২০২৩-২৪ প্রান্তিকে দেখা যায় তা ০.২৬% এ দাঁড়িয়েছে। যতটুকু জানি যে কোন সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপন যাই বলা হোক পরবর্তীতে তার একটা মূল্যায়ন বা পুনঃমূল্যায়ন হওয়া উচিৎ, এক্ষেত্রে যে আদৌ কিছু হয়নি তা উপরের বিবরণের বর্ণনাই যথেষ্ট।
অন্যদিকে এই সার্কুলারের শেষ কথা বা মোদ্দা কথা হলো মোটর বীমা কভারেজ এবং অ্যাক্ট লায়াবিলিটি (থার্ড পার্টি) বীমাকে বাধ্যতামূলক অবস্থা থেকে ঐচ্ছিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। এর কুফলস্বরূপ যা হলো, তা এই খাত থেকে বছরে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। এছাড়াও, মোটর বীমা কভারেজ না থাকায় প্রতি বছর আনুমানিক ১০,০০০ মানুষ মৃত্যু, পঙ্গুত্ব বা গুরুতর আঘাতের শিকার হলেও কোনরূপ বীমা কভারেজের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে তখন সেই পরিবারটি সমাজের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এটাই স্বাভাবিক। যদি মোটর বীমা বহাল থাকতো, তাহলে এটা দিয়ে সামাজিক দায়িত্ব পালনেরও কিছুটা সুযোগ তৈরি হতো।
ধরা যাক (হাইপোথিটিক্যালি), মৃত্যবরণ করা ১০,০০০ মানুষের মধ্যে ৫০০ জন ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি, অন্যদিকে এই ৫০০ জন একমাত্র উপার্জনক্ষম মৃত ব্যাক্তির মধ্যে অন্তত ৫০ জন মৃত ব্যাক্তি যদি তার পরিবারকে একেবারে কপর্দকহীন অবস্হায় রেখে যায়, আর ঐ ৫০টি পরিবারের সদস্য/সদস্যা বা ছেলে-মেয়েরা শুধু জীবিকার জন্য কোন কুল কিনারা না পেয়ে যদি অসামাজিক কাজে বা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে পড়ে তাহলে সমাজের বোঝা বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজকে কুলষিত করার দায়ও কি এই সার্কুলার এড়াতে পারে !
এই সার্কুলারকে নিঃসন্দেহে ‘বৃদ্ধির পরিপন্থী’ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বীমা পেশাদারদের অভিমত, এহেন প্রবৃদ্ধি পরিপন্থী অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রায়শই অপেশাদারদের প্রভাব এবং অন্যায্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। বীমা শিল্পের এই চরম অচলায়তনের জন্য নীতি নির্ধারকদের অপেশাদারিত্ব একটি প্রধান কারণ। বীমাশিল্পকে ক্রমাগতভাবে স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়ে আসলে কে কার স্বার্থ রক্ষা করছে বোঝা মুশকিল। একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বীমাগ্রহিতা ও বীমাকারীর মধ্যে, যা আইন দ্বারা স্বীকৃত। বীমা বিষয়ক বা বীমা শিল্পে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন বা সংস্কারের ক্ষেত্রে বীমা চুক্তির উভয়পক্ষের সম্মতিতে বা ঐক্যমতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্যভাবে করা উচিৎ, কখনই একমুখী সিদ্ধান্তের বিষয়টি সার্বজনীনভাবে কল্যাণকর হতে পারে না। জানিনা বর্তমানে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ - ওউজঅ) আর কতদিন পর এ ব্যাপারে কার্যকরী, সময়পোযোগী ও যুগপোযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, নাকি এভাবেই চলবে। এমন কথা কি ভাবা যায় - বীমা খাতে জিডিপি’র অংশীদারিত্ব আর কত নিম্নমুখী হলে সংশ্লিষ্টদের ইতিবাচক কিছু করার সময় হবে মোটর বীমা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা?
