শিরোনাম

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন, নিহত-আহতদের ভিড়ে সংকটে হাসপাতাল: বিবিসি

 প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন, নিহত-আহতদের ভিড়ে সংকটে হাসপাতাল: বিবিসি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে দেশটির অন্তত তিনটি হাসপাতাল নিহত ও আহত রোগীতে উপচে পড়েছে বলে জানিয়েছে চিকিৎসাকর্মীরা। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের একটি হাসপাতালের এক মেডিকেল কর্মকর্তা জানান, সেখানে তরুণদের মাথা ও বুকে সরাসরি গুলি করা হয়েছে। আরেকজন বলেন, রাজধানীর একটি বিশেষায়িত চোখের হাসপাতাল ‘সংকটকালীন’ অবস্থায় চলে গেছে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা দুই চিকিৎসাকর্মী জানিয়েছেন, গুলি ও পেলেট দিয়ে ছোড়া গুলির ক্ষত নিয়ে আসা আহতদের চিকিৎসা করেছেন। 

এদিকে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনা ঘটলে তা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে। অন্যদিকে ইরান সরকার অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে ‘সহিংস ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে’ পরিণত করছে।


সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘ইরান এমন এক স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যা হয়তো আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত।’ প্রায় দুই সপ্তাহ আগে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে রাজধানী তেহরানে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দেশটির সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে শতাধিক শহর ও জনপদে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এ পর্যন্ত শত শত বিক্ষোভকারী নিহত বা আহত হয়েছেন এবং আরও অনেককে আটক করা হয়েছে। বিবিসি পারসিয়ান অন্তত ২৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে, যাদের মধ্যে ছয়জন শিশু।


বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একটি মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, নিহত নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা অন্তত ১৪। বিবিসি পারসিয়ান নিশ্চিত করেছে, শুক্রবার রাতে উত্তর ইরানের রাশত শহরের পোরসিনা হাসপাতালে অন্তত ৭০টি মরদেহ আনা হয়। হাসপাতালের মর্গে জায়গা না থাকায় মরদেহগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, নিহতদের মরদেহ দাফনের জন্য স্বজনদের কাছ থেকে সাত বিলিয়ন রিয়াল (প্রায় ৫ হাজার ২০০ পাউন্ড) দাবি করা হয়েছে।


ইরানে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তেহরানের এক হাসপাতালকর্মী বলেন, ‘দৃশ্যগুলো ছিল ভয়াবহ। এত বেশি আহত ছিল যে অনেকের ক্ষেত্রে সিপিআর দেওয়ারও সময় পাওয়া যায়নি। প্রায় ৩৮ জন মারা গেছে। অনেকেই জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। তরুণদের মাথা ও বুকে সরাসরি গুলি করা হয়েছে।’


তিনি আরও জানান, মর্গ পূর্ণ হয়ে গেলে মরদেহগুলো নামাজের কক্ষেও স্তূপ করে রাখা হয়। নিহত ও আহতদের বেশিরভাগই ছিলেন ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ।


একজন চিকিৎসক স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করে বিবিসিকে জানান, ‘তেহরানের প্রধান চক্ষু হাসপাতাল ফারাবি সংকটকালীন অবস্থায় রয়েছে। জরুরি নয়-এমন ভর্তি ও অস্ত্রোপচার স্থগিত করা হয়েছে।’ ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণত বিক্ষোভ দমনে পেলেট ছোড়া শটগান ব্যবহার করে। কাশান শহরের এক চিকিৎসক জানান, অনেক বিক্ষোভকারী চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে এসেছেন।

এক চিকিৎসক বলেন, ‘আমি এমন একজনকে দেখেছি, যার চোখে গুলি লেগে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেছে।’শিরাজ শহরের একটি হাসপাতাল থেকেও আহতদের ঢল নামার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে পর্যাপ্ত সার্জনের অভাবে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক মেডিকেল চিকিৎসক।


এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, শুক্রবার রাতে তেহরানে বিক্ষোভকারীরা ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে যান, যানবাহনে আগুন দেন এবং রাজধানীর কাছে কারাজ শহরে একটি সরকারি ভবন জ্বালিয়ে দেন।এর পর ইরানি সেনাবাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, তারা সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হবে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ‘সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।যদিও ইরানি পুলিশ দাবি করেছে, শুক্রবার রাতে তেহরানে কেউ নিহত হয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, অন্তত ২৬টি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

ইইউ প্রধান উরসুলা ফন ডার লায়েন ইরানে বিক্ষোভে সহিংস দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইউরোপ জনগণের আন্দোলনের পাশে রয়েছে। জাতিসংঘও প্রাণহানিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নেতারা যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকার পিছু হটবে না। এদিকে ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি বিক্ষোভকে ‘মহিমান্বিত’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার সাইমন গ্যাস সতর্ক করে বলেছেন, সংগঠিত বিকল্প নেতৃত্বের অভাবে এখনই শাসন পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

এই বিক্ষোভ ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া গণআন্দোলনের পর সবচেয়ে ব্যাপক বলে মনে করা হচ্ছে। তখন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২০ হাজার আটক হয়েছিল।


 


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর: