ফরচুনের ফাঁদে আইসিবি: রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থার আর্থিক দুরবস্থার নতুন অধ্যায়
জোনায়েদ মানসুর: রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্থাটি নিজেই অনিয়ম, লোকসান ও অদক্ষ বিনিয়োগের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ—ফরচুন সুজ লিমিটেডে আইসিবির বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, যা এখন রূপ নিয়েছে ভয়াবহ ক্ষতিতে। জানা গেছে, ২০২২ সালের ৯ মে আইসিবি প্রতি শেয়ার ১২৪ টাকা ২৩ পয়সা দরে ফরচুনের ২৫ লাখ শেয়ার ক্রয় করে। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আরও ২৫ লাখ শেয়ার কেনা হয় ৭৯ টাকা ৬৬ পয়সা দরে। দুই ধাপে মোট ৫০ লাখ শেয়ার, গড় ক্রয়মূল্য ১০১ টাকা ৯৪ পয়সা, বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। দুই বছর পর, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর পুঁজিবাজারে ফরচুনের শেয়ারমূল্য নেমে আসে ১৮ টাকা ৯০ পয়সায়। বাজারমূল্যে এখন ওই শেয়ারের দাম মাত্র ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আইসিবি লোকসান গুনছে ৪১ কোটি ৫২ লাখ টাকা—যা সংস্থাটির ইতিহাসে অন্যতম বড় ক্ষতি।
প্রশ্নের মুখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত : আইসিবির এই বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে উঠেছে নানা প্রশ্ন। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ফরচুন সুজের মৌলভিত্তি ছিল দুর্বল, আর্থিক প্রতিবেদনও ছিল না শক্তিশালী। তবু কেন রাষ্ট্রীয় একটি সংস্থা এমন উচ্চ মূল্যে শেয়ার কিনবে, তা নিয়েই এখন চলছে আলোচনা। অভিযোগ আছে, কারসাজিকারীদের সুবিধা দিতে আইসিবির অভ্যন্তরীণ একটি প্রভাবশালী চক্র এই শেয়ার ক্রয়ে চাপ দিয়েছিল। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যখন বাজারে ফরচুন সুজের শেয়ার ৮০ টাকার নিচে নেমে আসছিল, তখনই আবার নতুন করে কেনা হয় আরও ২৫ লাখ শেয়ার। এটা ছিল সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।”
কারসাজির অভিযোগ ও বিএসইসির পদক্ষেপ : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ফরচুন সুজের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে। কোম্পানিটিকে সম্প্রতি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিএসইসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “ফরচুন সুজের আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ প্রদানে অনিয়ম ধরা পড়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক ওঠানামা ও লেনদেনের প্যাটার্নেও কারসাজির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।” তদন্ত সূত্রে জানা যায়, বিএসইসি ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির তদন্তে একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। ফরচুন সুজের শেয়ার কেনাবেচা এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইসিবির ভেতরের অনিয়ম ও ফারুক আলমের পদত্যাগ : আইসিবির পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডিজিএম ফারুক আলম ছিলেন সংস্থাটির এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এমডির ঘনিষ্ঠ হিসেবে বাজার কারসাজিকারীদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করতেন। তদন্ত শুরু হওয়ার পরই ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। যদিও কারণ হিসেবে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে—তদন্তের আগাম ইঙ্গিত পেয়েই তিনি পদত্যাগ করেন। একজন কর্মকর্তা জানান, “ফারুক আলমের মাধ্যমে বহু শেয়ার লেনদেনে অনিয়ম হয়েছে। ফরচুন সুজ তার বড় উদাহরণ। বিএসইসির তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
রাষ্ট্রীয় তহবিলের ঝুঁকি ও বিনিয়োগকারীর ক্ষতি: আইসিবির বিনিয়োগ শুধু সংস্থার ক্ষতি নয়—এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীর ক্ষতি। কারণ আইসিবি পুঁজিবাজারে আস্থার প্রতীক। প্রতিষ্ঠানটি যদি দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কিনে ক্ষতির মুখে পড়ে, তাহলে ছোট বিনিয়োগকারীরা সেই কোম্পানির প্রতি আস্থা পোষণ করে বিনিয়োগ করে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হন। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “আইসিবির পোর্টফোলিওতে এখন জাঙ্ক শেয়ারের ছড়াছড়ি। এসব থেকে ভালো কিছু আসবে না। আইসিবি নিজের টাকা হারিয়ে তারল্য সংকটে পড়েছে। এখন আর তাদের দিয়ে জোর করে শেয়ার কেনানো যাবে না।”
পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা বৃদ্ধি : আইসিবির মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের অস্বচ্ছ বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। ফরচুন সুজে বিনিয়োগের ক্ষতি শুধু একটি কোম্পানির ব্যর্থতা নয়—এটি পুরো সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থার নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, “যখন রাষ্ট্রীয় সংস্থা কারসাজিকারীদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে, তখন বাজারে বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস হারায়। ফরচুনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে আইসিবিকে পুরোপুরি কাঠামোগত সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।”
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা : আইসিবির উচিত হবে তার পোর্টফোলিও পুনর্মূল্যায়ন করা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকা। একইসঙ্গে বিএসইসির চলমান তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে জনস্বার্থে। যদি প্রমাণিত হয় যে কর্মকর্তারা কারসাজিকারীদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে—নয়তো রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
ফরচুন সুজে আইসিবির ৪১ কোটি টাকার ক্ষতি কেবল আর্থিক নয়—এটি পুঁজিবাজারের নৈতিকতা, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। এখন সময় এসেছে, আইসিবি নিজেদের দায় স্বীকার করে জনআস্থার পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করার—না হলে ফরচুনের মতো আরও অনেক "ফরচুন" রাষ্ট্রীয় সম্পদের জন্য কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
এ বিষয়ে ফরচুন জুতা লিমিটেড ও ইউনিওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, আমি ব্যস্ত আছি। পরে আপনাকে বিস্তারিত বলব। একটু অপেক্ষা করেন। এরপর নিউজটি প্রকাশ না করার জন্য নানা পথ অবলম্বন করেন। কিন্তু কোনো তথ্যই বা কোনো বক্তব্যই প্রদান করেননি।
এ বিষয়ে ফরচুন জুতা লিমিটেড ও ইউনিওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব নাজমুল হোসাইন দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, আমি গত ১৮ নভেম্বর এই কোম্পানিতে যোগদান করেছি এবং আমি শেয়ার বিভাগে কাজ করছি তাই এই সমস্যা সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। আমার অ্যাকাউন্টস বিভাগের সাথে আলোচনা করা দরকার। এর পরে আমি আপনাকে এই সমস্যা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারি। এর কয়েকদিন পর তাদের ঢাকার নিকুঞ্জ অফিসে যাওয়া হয়। ইনয়িবিনিয়ে নানা কথা বলেন। এবং নিউজ প্রকাশ না করতে বলেন।
