শিরোনাম

পোশাক খাতে বিদায়ী বছর কেমন গেল

 প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৯ অপরাহ্ন   |   পোষাক শিল্প

পোশাক খাতে বিদায়ী বছর কেমন গেল


গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার কাঙ্ক্ষিত অভ্যুত্থানের পর পোশাকশিল্পে দেখা দেয় অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা। কিছু কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। নিরাপত্তার বিবেচনায় অনেক কারখানা মালিক-কর্তৃপক্ষই বন্ধ করে দেন। এরকম আরও কিছু কারণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। একটা লম্বা সময় ধরে এমন পরিস্থিতি বিদেশি ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের মধ্যেও শঙ্কা ছড়ায়। সময়মতো পণ্য হাতে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় কিছু কারখানায় রপ্তানি আদেশ স্থগিত রাখা হয়। এসব ঘটনা গোটা রপ্তানি খাতকে অনিশ্চতায় ফেলে। এরকম কিছু উদ্বেগজনক বাস্তবতা নিয়ে ২০২৫ সাল শুরু হয়।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি আলোচিত ও উদ্বেগজনক ঘটনা ছিল বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা। শিল্প যখন অভ্যুত্থান-পরবর্তী জটিলতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছিল, তখন এই সিদ্ধান্ত একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়। যাহোক, দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্ক ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে। তবে আগে থেকে বিদ্যমান গড়ে ১৬ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোট শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ শতাংশে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় অংশ ক্রেতারা উৎপাদকদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। ফলে অনেক কারখানার জন্য এটি রীতিমতো টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তাই ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছেন। 


এ অবস্থায় সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার বিপরীতে অফডকগুলো কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করে। হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা না বাড়লেও মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ানো প্রস্তাব ছিল অযৌক্তিক, যা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়ে গেছে। 


গত ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আকাশপথে আমদানি করা পণ্যের একটি বড় অংশই যেহেতু পোশাক খাতের কাঁচামাল, অ্যাকসেসরিজ ও সময়সংবেদনশীল স্যাম্পল, তাই এই অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব ছিল ব্যাপক। তবে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দ্রুততার সঙ্গে বিমানবন্দরটির কার্গো কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।


অক্টোবরে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও সেখানে কোনো শ্রমিক হতাহত হননি। এটি পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গত এক দশকে অর্জিত অগ্রগতিরই প্রতিফলন। তবুও নিরাপত্তার প্রশ্নে সবসময়ই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।


এ ছাড়া সম্প্রতি মিরপুরে সংঘটিত একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুরুতে কিছু গণমাধ্যমে সেটিকে পোশাক কারখানা হিসেবে উল্লেখ করে। পরে জানা যায়, সেটি আসলে রপ্তানিমুখী কোনো কারখানা ছিল না। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপতথ্য যাতে ছড়িয়ে না পড়ে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে আরও সচেতন থাকতে হবে।


আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫। এই আইনের কিছু বিধান–বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, বাধ্যতামূলক ভবিষ্য তহবিল এবং শ্রমিক সংজ্ঞা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেশের বাস্তবতা ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিমত। এসব বিধান কার্যকর হলে শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করবে। এসব বিষয় সরকারের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। 


পোশাকশিল্পের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেয়ে এসেছে। এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা থাকবে না। ফলে উচ্চ শুল্কের মুখে পড়তে হবে, যা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেবে এবং রপ্তানি কমার ঝুঁকি তৈরি করবে। 


এই প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প নেই। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বহুমুখীকরণ, শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে হবে। জিএসপি প্লাসের মতো সুবিধা পেতে হলে শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন ও মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিষয়ে আরও কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক মান মেনে চলতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ডিউ ডিলিজেন্স আইন সামনে রেখে শিল্পকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।