প্রচ্ছদ / মতামত / কারিগরি শিক্ষার মানোন্নায়নে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দরকার

কারিগরি শিক্ষার মানোন্নায়নে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দরকার

মোঃ তারিকুল ইসলাম: বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে যেমনি মানোন্নায়ন জরুরী তেমনি এই শিক্ষার প্রতি মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও দরকার। কারণ আমাদের দেশের বিশাল সংখ্যার জনগোষ্ঠিকে এই শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে প্রয়োজন মানসম্পন্ন যুগোপযোগী উন্নত শিক্ষা কাঠামো। সাথে সাথে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করা, ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি ও ব্যাপক প্রচার প্রসার খুবই জরুরী।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করেছে কারিগরি শিক্ষার উপর ভর করে। তাদের কৃষি, শিল্প ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি যুগোপযোগি মানসম্মত কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা। অথচ আমাদের দেশের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। এখানে কারিগরি শিক্ষার প্রতি সমাজের অনেকেরই এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। সামাজিকভাবে ধরে নেয়া হয় যারা পড়াশুনায় ভাল নয় তারা টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে শিক্ষা নিতে আসে। যা আজ আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। এর ফলে অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রী ও অভিভাবকমহল সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বেশী আগ্রহী হয়ে থাকে। অথচ কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা গ্রহণ করলে দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারত।
যদি কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করা যেতো এবং বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী এই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো যেতো তাহলে দেশে বিদেশে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হতো। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশের দক্ষ জনশক্তির অর্ধেকেরও বেশি আসে কোরিয়া, চীন, ভারত সহ বাহিরের দেশ থেকে যারা আমাদের দেশের গার্মেন্টম, সিরামিক, ঔষধ, ভৌত-অবকাঠামো সহ বিভিন্ন শিল্পে কাজ করে থাকে। অথচ আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক লোক এসব শিল্পে শুধু শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে। সারা দেশে বিভিন্ন পেশায় বর্তমানে প্রায় ৮৫ হাজার ৪৮৬জন বিদেশি নাগরিক কর্মরত রয়েছেন যার বেশিরভাগ নাগরিকই বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কারিগর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর বিশাল অংকের বাজেট বরাদ্দ করতে হচ্ছে এই ধার করা দক্ষ জনশক্তির জন্য। এক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এ সকল বিদেশী দক্ষ জনশক্তির পিছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে দেশের মধ্যেই দক্ষ জনশক্তি তৈরী করা সম্ভব হতো এবং এ বিশাল অংকের ব্যয় বরাদ্দের প্রয়োজন হতো না।
যদিও সরকার কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব উপলদ্ধি করে অতি সম্প্রতি শিক্ষার মানোন্নয়নে ৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি থেকে অনুমোদন করে। সেখানে ১০০টি উপজেলায় একটি করে কারিগরি স্কুল এ্যান্ড কলেজ নির্মাণ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহণ করে যা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ ছাড়া বর্তমানে সরকার আলদাভাবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড গঠন করে নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নেয়। বলাবাহুল্য মেয়েদের কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত ও আকৃষ্ট করতে মহিলা পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারের যুব ও ক্রীড়া এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে বেকার যবুক ও মহিলাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক হাজার কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও অনেক এনজিও মেয়েদের ও বেকার যুবকদের সেলাই, ড্রাইভিং ও হস্তশিল্পসহ নানা ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তবে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব সরকারী বেসরকারী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এ সকল প্রতিষ্ঠান কি যুগোপযোগী শিখন ও শিক্ষণ এর ব্যবস্থা দিতে পারছে? তাদের কোর্স কারিকুলাম কি মানসম্মত? শিক্ষা গ্রহনের উপযুক্ত পরিবেশ কি বিদ্যমান? ব্যবহারিক শিক্ষার সকল সুযোগ সুবিধা কি পর্যাপ্ত? এই বিষয়গুলো এখন ভাবনার দাবী রাখে। তাই এ ব্যাপারে কিছু পরামর্শ তুলে ধরলামঃ
প্রথমতঃ কারিগরি শিক্ষায় গুণগতমান উন্নয়নে এই শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি কোয়ালিটি অ্যাস্যুয়েরেন্স সেল করতে হবে। যা প্রতিনিয়ত কারিগরি শিক্ষায় গুণগত মানোন্নায়ন কাজ করে যাবে।
দ্বিতীয়তঃ কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে হবে। এ শিক্ষার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরতে হবে।
তৃতীয়তঃ কারিগরি শিক্ষার মানোন্নায়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।
চতুথর্তঃ প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় যে সকল অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ে তাদের কারিগরি ও কর্মমূখি শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে তাদের আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চমঃ বিশেষ করে মেয়েদেরকে এই কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে এবং পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। কারণ মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই।
ষষ্ঠঃ কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কারিকুলাম, পাঠক্রম, শিখন- শিক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও উন্নত করতে হবে।
এছাড়াও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীর মানস¤পন্ন উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে এই শিক্ষার প্রতি মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। সাথে সাথে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও যোগ্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কুটির শিল্প, বয়ন, জাহাজ শিল্প, ইস্পাত শিল্প সহ পাটকল, চিনিকল প্রভৃতি স্থাপন করা ও পুরাতন শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে দ্রুত সংস্কারে জোর দিতে হবে। যাতে করে এই শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশে বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান এর সুযোগ পায়। তাই সাধারণ শিক্ষার ন্যায় কারিগরি শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে এ ব্যাপারে বাস্তবতা হল, সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও কারিগরি শিক্ষা যে এখনো যথোপযুক্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সুতরাং এখন সময় এসেছে এসব নিয়ে চিন্তাভাবনার। তাই কারিগরি শিক্ষার মান্নোয়নে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনসহ প্রশাসনিক সহযোগিতা খুবই দরকার। অন্যথায় দেশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সত্যিই দূরূহ কাজ হবে।
মোঃ তারিকুল ইসলাম, শিক্ষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, সেলফ এ্যাসেসম্যান্ট কমিটি, আইকিউএসি।

About arthonitee

Check Also

বিজয়ের মাসের আলোকসজ্জা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আগে নয়

সাকিব জামাল:  শুরু হলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর । মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *