প্রচ্ছদ / মতামত / “দোকলাম থেকে গালওয়ান” যুদ্ধ নাকি মহড়া?

“দোকলাম থেকে গালওয়ান” যুদ্ধ নাকি মহড়া?

মোর্তুজা মিশু:
চীন আগামীর বিশ্বে নেতৃত্বের জন্য নিজেদের সুসজ্জিত করে নিচ্ছে। বিশ্ব নেতৃত্বে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র কে মোকাবিলা করার জন্যই তাদের সাঝসাঝ রবরব। যেহেতু চীনের অবস্থান এশিয়ায় তাই তারা প্রথমেই এশিয়ায় সব কাঁটা সরিয়ে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়াতে চাচ্ছে। আর এই পরাশক্তি হতে হলে চীন সীমান্তবর্তী ভারতকে অবদমিত করার জন্য মরিয়া। এর মধ্য সামরিক দিক বিবেচনায় তাদের জন্য উদ্বেগজনক যায়গাগুলে হচ্ছে ভারত সীমান্তবর্তী তিব্বত, চিকেন নেক, আকসাই চীন,অরুনাচল,প্যাংগং হ্রদ, গালওয়ান উপত্যকা, লাদাখের ডেমচক ও সিকিমের নাথু লায় ও ভূটান সীমান্তবর্তী দোকলাম। এ সীমানাগুলোতে ভারত চীন সবসময়ই একে অপরকে প্রতিহত করতে মরিয়া ও সচেষ্ট থাকে।

ম্যাকমোহন লাইন ও লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল(এলএসি)

ভারত-চীন সীমান্তে বিতর্কীত ও অমিমাংসীত সীমারেখা ম্যাকমোহন ১৯১৪ সালের সিমলা চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যার অবস্থান ভারত-চীন পূর্ব সীমান্তে। অন্যদিকে সীমান্তঘেঁষা অরুনাচল পুরোটাই চীন নিজেদের ভূখন্ড বলে দাবী করে আসছিলো। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬২ সালে দুদেশের মধ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে চীনের বিজয় এবং আকসাই চীনের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল অন্যদিকে ভারতকে অরুনাচল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে ১৯৮০–এর দশকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চীনের নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সমজোতার ভিত্তিতে এই এলাকা শাসন করে আসছিলো। পরে অবশ্য ১৯৯৩ সালে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয় দুদেশের মধ্য। ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সালে ৭৩ দিনের যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তা–ও যুদ্ধে গড়ায়নি মূলত ১৯৯৩ সালে হওয়া চুক্তিটির কারণে।

মিরর পজিশনে ভারত-চিন কেনো বা কি কারনে থাকে?

সামরিক ভাষায় দুপক্ষ সমানতালে সুসজ্জিত হয়ে সীমান্তে সমতার ভিত্তিতে অবস্থা করাই হলো মিরর পজিশন। সর্বশেষ ১৯৭৫ সালে দুদেশের মধ্যে অস্ত্র যুদ্ধ হয়েছিলো। এর পর ১৯৯৩ সালে হয়ে গেলো দুদেশের মধ্য সীমান্ত চুক্তি। ১৯৯৩ সালে নরসিমহা রাও যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়ে মেইন্টেন্যান্স অফ পিস এন্ড ট্র্যাঙ্কুয়েলিটি চুক্তিটি সাক্ষরিত হয়েছিল। “দুটো দেশের মধ্যে এরকম সিদ্ধান্ত রয়েছে যে ফ্রন্ট লাইনে যেসব সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবেন, তাঁদের কাছে কোনও রকম অস্ত্র থাকবে না। যদি সেনা র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী কোনও অফিসারের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা নিয়ম হয়, তাহলে তার নল মাটির দিকে ঘুরিয়ে রাখা থাকবে। সেজন্যই দুই দেশের সেনাসদস্যদের হাতাহাতি বা কুস্তি করার বা পাথর নিক্ষেপের ভিডিও দেখা যায়। এচাড়া ১৯৯৬ সালে আস্থা বর্ধক ব্যবস্থাপত্রে সই করে দুই দেশ। ২০০৩ আর ২০০৫ সালেও চুক্তি হয়েছে। আর ২০১৩ সালে সই হওয়া বর্ডার ডিফেন্স কোঅপারেশন এগ্রিমেন্টই এ বিষয়ে সর্বশেষ চুক্তি। আর এ সকল চুক্তির কারনেই ভারত-চীন মিরর পজিশনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান করে।

২০১৭ ডোকলাম বিবাদের নেপথ্যে

দোকলাম বিবাদ ঘটে চীনের সেনাবাহিনী যখন ডোকলামে সড়ক নির্মান শুরু করে। চীনে ডোকলাম এলাকা ডিক্ল্যাং, বা ডনল্যাং কাওচং (ডনল্যাং চারণভূমি বা চারণভূমির ক্ষেত্র) নামে পরিচিত। ১৬ জুন ২০১৭ সালে চীনের সৈন্যরা নির্মাণাধীন যানবাহন ও রাস্তাঘাট নির্মাণের সরঞ্জাম দিয়ে দখল করে একটি বিদ্যমান সড়কে দক্ষিণমুখী ভাবে ডোকলাম এলাকাতে নির্মান শুরু করে এবং এই অঞ্চলটি নিজের বলে দাবি করে, যখন ভারত ও ভুটান ভুটানের অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। ১৮ ই জুন, ২০১৭ তারিখে চীনের সৈন্যদের রাস্তা নির্মাণের জন্য দোখালাতে অস্ত্র ও অস্ত্রসহ ২৭০ ভারতীয় সৈন্য প্রবেশ করেছে। যার ফলে উভয় পক্ষ একটি স্থান উপর অধিকার দাবি করে।
অবশেষে দুই মাস পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দোকলামের ঘটনা নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারত ও চীনের কূটনৈতিকভাবে আলাপ আলোচনা হয়েছে। এর ভিত্তিতে দুই পক্ষ দোকলামে উত্তেজনায় জড়ানো থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে একমত হয়েছেিলো ঐ সময়।

গালওয়ান উপত্যকায় উত্তেজনা ও পরিনতি

চীন–ভারত সীমান্তের এই অংশ ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়। তিব্বতের চীন থেকে আলাদা হতে চাওয়া এবং তাতে ভারতের সমর্থন দেওয়া—এই সবই এখন ইতিহাস। এ নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয় ১৯৫৯ সালে যখন ভারত তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামাকে আশ্রয় দেয়, যাকে চীন মনে করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা।
সর্বশেষ এই বিরোধের সূচনাটি হয় ৫–৬ মে। মঞ্চটি ছিল পূর্ব লাদাখ, প্যাংগং হ্রদের উত্তর পারের এই অঞ্চলটিকে বলা হয় ফিঙ্গার–ফাইভ।
৫ মে লাদাখে এলএসির গালওয়ানে ভারতকে রাস্তা তৈরিতে চীন বাধা দেয়। একই সময় প্যাংগং হ্রদে ভারতীয় টহল দলকেও বাধা দেওয়া হয়। চার দিন পর ৯ মে সিকিম-তিব্বত সীমান্তে নাকুলায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে দুই দেশের সেনারা। দুই সেক্টরেই দুই দেশের সেনারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। ঢিল ছোড়াছুড়িও চলে। এচাড়া উত্তেজনার বশে ভারী অস্ত্রশস্ত্র সহ সীমান্তে সহ অবস্থান করে দুই দেশ যার মধ্যে কামান এবং যুদ্ধের গাড়িও রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘাতের পরিবেশ বিরাজ করায় এসব অস্ত্রের মজুত করা হয়েছে। এভাবে সহ অবস্থান করতেছিলো দু দেশ। সর্বশেষ ১৫ই জুন ভারতীয় নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে একটি পেট্রল টিম টহলে নামে এবং তাদের উপর অতর্কিত হামলা করে চীনা সেনারা। তারা হাতে তৈরি একধরনের অস্ত্র দিয়ে ভারতীয় সেনাদের অাগাত করে। যার ফলে ঐ রাতেই ভারতের ২০ সেনা নিহত হয় এবং প্রায় ১০০ জন আহত হয়। চীন ভারতীয় ১০ সেনা সদস্য কে ধরে নিয়ে যায় এবং প্রায় ৬ ঘন্টার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষ অাটক ভারতীয় সেনাদের মুক্তি দেয় চীন। অন্যদিকে চীন কোন হতাহতের কথা স্বীকার না করলেও ধারনা করা হচ্ছে তাদের অন্তত ৪৩ জন সেনাসদস্য আহত হয়েছে। দুদেশের আলোচনা হয়েছে হবে, তবে এখন পর্যন্ত সীমান্তে সহ অবস্থানে চীন-ভারত।

এর শেষ কোথায়?

তিব্বত, চিকেন নেক, আকসাই চীন,অরুনাচল,প্যাংগং হ্রদ, গালওয়ান উপত্যকা, লাদাখের ডেমচক ও সিকিমের নাথু লায় ও ভূটান সীমান্তবর্তী দোকলাম এস জায়গায় কখনো এরা কাউকেই একক কর্তৃত্ব দিতে চাইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না যুদ্ধের মাধ্যমে সুরাহা হবে। তবে এশিয়াতে এর রেশ থেকে যাবে। ইতোমধ্যে নেপালের মতো ভারতীয় লেজুড়বৃত্তিক দেশও ভারতকে চোখ রাঙ্গিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে চীনের মদদে।। ভুটানও একই পথে। শ্রিলঙ্কায় চীনের অনেক বিনিয়োগ। হাম্বামটোটা বন্ধর চীনের অধীনে তাই সঙ্গত কারনেই শ্রীলঙ্কা চীনের পক্ষেই থাকবে। পাকিস্তানের সাথে চীনের রয়েছে মিত্র সম্পর্ক। পাকিস্তান চীনের বর্তমান সম্পর্ক অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো। মিয়ানমার সরকার বলা যায় চীনের কুক্ষিগত। বাংলাদেশের সাথে দু দেশেরই ভালো সম্পর্ক। এই দেশগুলো ছোট হলেও যে কোন দেশকে ঘিরে ধরতে হলে অবশ্যই প্রতিবেশি দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক চাই। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর আওতায় প্রায় ৭০০ সিটিকে সংযুক্ত করতে চায় চীন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কে ৬ টি সিস্টারসিটি নির্মানের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। বাংলাদেশের ৫০০০ এরও বেশি পন্যকে চীনে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে চীন। এমন করেই ভারতের সকল প্রতিবেশী দেশকে বাগে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র বড় বড় দেশগুলো ভারতকে সমর্থন দিচ্ছে। রাশিয়া চীনের মিত্র হলেও ভারতের সাথেও তাদের সুসম্পর্ক। ভারত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্রে বাজার। তাই হয়তো রাশিয়েকেও কাছে পাবে না চীন। ভারতের চেয়ে সামরিক শক্তিতে ৩ গুন এগিয়ে থাকা চীন সামনে কি করে তাই দেখার অপেক্ষায়।

About jne

Check Also

করোনা প্রতিরোধের চলমান উপায়গুলোকে দৈনিন্দন অভ্যসে পরিণত করতে হবে

স. ম. গোলাম কিবরিয়া : অফিসের পথে মেসেঞ্জারে পাওয়া শুভ সকালের উত্তর দেই প্রতিদিন। সেইসাথে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *