প্রচ্ছদ / মতামত / বায়োফ্লক ফিশ ফার্মিং, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

বায়োফ্লক ফিশ ফার্মিং, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

শফিউল আল শামীম:

প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি খাতে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্তের নাম বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ। যেখানে কোন পুকুর, খাল কিংবা নদী নয় বরং আপনার বাড়ির আঙিনার এক চিলতে পরিমাণ জায়গা যোগান দিতে পারে সারা বছরের আমিষের। পদ্ধতিটি ইন্দোনেশিয়া, চীন সহ বিভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ প্রযুক্তিটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে একটু চেষ্টা করলে যে কেউ বিশেষ করে একজন ছাত্র কিংবা গৃহবধূ বা পরিবারের যেকোন সদস্য উৎপাদন করতে পারে বিপুল সংখ্যক মাছ। বায়োফ্লক এমন একটি পদ্ধতি যেখানে অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক মাছ চাষ করা যায়। আর সবচেয়ে আশার বিষয় হচ্ছে এ পদ্ধতিতে মাছের জন্য খাবারের খরচ অর্ধেকে কমিয়ে আনা সম্ভব। কারণ বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছের মলমূত্র এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবারকে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করে তা আবার মাছকে খাওয়ানো হয়। এতে করে খাবারের খরচ যেমন কমে যায় অন্যদিকে ফ্লক উৎপাদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় মাছের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক অ্যামোনিয়া গ্যাস।

ট্যাংকে মাছ চাষের বেশ কয়েকটি পদ্ধতি চালু রয়েছে যেমন, রিসার্কুলেটেড অ্যাকুৃয়াফিনিক সিস্টেম বা সংক্ষেপে রাস, আলাস, বায়োফ্লক ইত্যাদি। তবে সবগুলো পদ্ধতির মাঝে সহজ এবং লাভজনক হচ্ছে বায়োফ্লক। কেননা, রাস পদ্ধতিতে একটি ট্যাংক সেট আপে কমপক্ষে অর্ধলক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয় যা সবার পক্ষে সম্ভব না। অথচ বায়োফ্লকে মোটামুটি ২০ হাজার টাকায় একজন উদ্যোক্তা ট্যাংক প্রস্তুত হতে শুরু করে পোনা সংগ্রহ করা পর্যন্ত সব কাজ সমাধা করতে পারেন। তাছাড়া ফ্লক উৎপাদনের কারণে ট্যাংকের পানি পরিবর্তন করতে হয় না বলে পানির অপচয়ও কম হয়।

আমরা মাছে ভাতে বাঙালি সত্য। কিন্তু আমাদের নদী, খাল-বিল গুলোতে আগের মতো তেমন একটা মাছের দেখা মিলে না। নতুনভাবে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করতে গিয়ে ধানিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে দিন দিন। ফলে মাছ উৎপাদন করতে গিয়ে ভাত উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। অপরদিকে পুকুরে ১০ মণ মাছ উৎপাদন করতে প্রায় ২০ শতক জায়গার প্রয়োজন এবং এতে বিভিন্নভাবে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও বেশী থাকে। অথচ বায়োফ্লকে সঠিক পরিচর্যায় মাত্র ১০ হাজার লিটার পানির ট্যাংকে ১০ মণ বা ততোধিক মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় তেলাপিয়া, শিং, মাগুর, পাবদা, পাঙ্গাশ, গুলসা, চিংড়িসহ মোটামুটি সব ধরনের মাছ উৎপাদন করা যায়।

বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে আমিষের চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশে রপ্তানি করতে বায়োফ্লক ফিশ ফার্মিং পদ্ধতি খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। আমাদের দেশে কমবেশি ২৬ লক্ষ শিক্ষিত বেকার রয়েছেন যারা বেকারত্বের অভিশাপ মাথায় নিয়ে সোনালি সময়গুলো ব্যয় করতেছেন হতাশা বা অপরাধে। সরকারের তরফ থেকে যদি এমন একটি পদ্ধতির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে একদিকে যেমন বহু যুবকের বেকারত্ব ঘুচবে অন্যদিকে মাছ রপ্তানিত করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিকমুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে ইন্টারনেটের কল্যাণে ইউটিউব দেখে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন এ পদ্ধতির ব্যাপারে এবং শুরুও করেছেন কেউ কেউ। তবে এ পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং স্পর্শকাতর। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না নিলে যেকোন সময় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। শুরুতেই হোঁচট খেলে সম্ভাবনার এই খাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে উদ্যোক্তারা। তাই বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা হবে বেকার সমস্যা সমাধানের এক যুগোপযোগী মডেল।

About arthonitee

Check Also

কি আছে ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর এর ভাগ্যে?

(এহছান খান পাঠান):   ভারতের একমাত্র মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য কাশ্মীর। কাশ্মীর এর স্বায়ত্তশাসন ও পরিচয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *