প্রচ্ছদ / Uncategorized / বাউন্ডারি লাইনের বাইরে থেকেঃ রোহিঙ্গা বসতি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাউন্ডারি লাইনের বাইরে থেকেঃ রোহিঙ্গা বসতি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

সফিকুর রহমান চৌধুরী টুটুল :

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বোঝার মত যথেষ্ট জ্ঞান আমার নাই। উদ্বাস্তু বিষয়ক আন্তর্জাতিক রীতিনীতি কি তাও ঠিকমতো জানিনা।তবে মোটাদাগে দেশপ্রেম বলতে কি বোঝায় তা বুঝি এবং কিসে আমার দেশের লাভ বা ক্ষতি সেটাও বুঝি।আরাকানের রোহিঙ্গারা যখন এদেশে ঝাঁকে ঝাঁকে পেটে একটা, পিঠে একটা, আর হাতে একটা নিয়ে আসছিল তখনই কোন এক টিভি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গারা শুধু সামাজিক নয় অর্থনৈতিক এবং ভৌগলিক দিক দিয়েও সীমাহীন হুমকির কারন হবে।একজন মানুষ যদি সারাদিন কোন কাজ না করে খাবার পায়, বাসস্থান পায়, কাপড় পায় তাহলে তার আর কি দরকার? সে শুধু বসে বসে খাবে আর চিন্তা করবে কেমনে এ অবস্থা বহাল রাখা যায়।এরপর তার যৌনচাহিদা মেটাতে গিয়ে একটার পর একটা বাচ্চা পয়দা করবে। রোহিঙ্গারা আমাদের এখানে এসেছিল এগার লাখ। এখন বাচ্চা পয়দা হয়েছে প্রায় তিন লাখ।দুই বৎসরে প্রবৃদ্ধির হার ২৭.২৭%। বাহ্ অমায়িক (!)। আমরা উন্নত দেশ হিসেবে অচিরেই আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছি। লোক সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে যাবো, ভারতকে ছাড়িয়ে যাবো। রোহিঙ্গারা এদেশে আসাতে আমরা যে সীমাহীন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি এবং আরো কি কি বাকি আছে তা’ কি আমরা হিসেব করছি? গা’ছাড়া ভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজ এগোচ্ছে বলে আমার মনে হয়। সরকার স্পষ্ট করে একটা টাইম লাইন বেঁধে দিক। “এই সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ নাহলে বাংলাদেশ বিকল্প কি কি করতে পারে বা করবে সেটা সর্বদলীয় একটা কনভেনশন করে সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলে দিক”। আমরা আর বাহবা চাইনা। কাজ দেখতে চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক একটা প্রতিনিধিদল এখানে আসছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছে,বিভিন্ন বানী দিচ্ছেন অতঃপর সবশেষে একটা সংবাদ সম্মেলন করে বিদায় নিচ্ছেন। এখন দেখি রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে কি কি সমস্যা সৃষ্টি করছে-
১)এগার লক্ষ লোকের বাসস্থানের জন্য বাংলাদেশের বিপুল পরিমান বন উজাড় হয়েছে,পাহাড় কাটা পড়েছে বিপুল।ফলে পরিবেশের ভারসাম্যে একটা বিরুপ প্রতিক্রিয়া অবসম্ভাবী।
২)রোহিঙ্গারা গোপনে স্থানীয়ভাবে মজুরের কাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের কাজ কম পারিশ্রমিকে করার কারনে স্থানীয় মজুরির দামে বিশাল একটা দরপতন ঘটেছে। ফলে স্থানীয় লোকদের জীবনমান অনেক নীচে নেমে গেছে।
৩)রোহিঙ্গাদের কারনে মাদকের ব্যাবসার প্রসার ঘটেছে জ্যামিতিক হারে। স্থানীয় ভাবে এটা নিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমও থেমে নেই। প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটছে।
৪) সারাদেশে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আমাদের সাধারণ বাঙ্গালীদের সাথে মিশে যাচ্ছে ফলে সামাজিক একটা অসামঞ্জস্যতা তৈরী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
৫) যে মাত্রায় রোহিঙ্গারা প্রজনন বাড়াচ্ছে তাতে একসময় পার্বত্য এলাকায় ওরাই সংখ্যাগরিষ্ট হয়ে যাবে ফলে ভু-রাজনৈতিক সমস্যা প্রকট হয়ে যেতে পারে।
৬) এত বিপুল পরিমান মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানো আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত দেশের পক্ষে কতদিন সম্ভব? আমাদের কি সেই সামর্থ্য আছে?
৭) প্রকৃতিগতভাবে রোহিঙ্গারা শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং কিছুটা অসহিষ্ণু। সামান্য অজুহাতেই তারা মারামরিতে লিপ্ত হয় বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। ফলে এটা ঐ এলাকার আইনশৃঙ্খলার অবনতির অন্যতম কারন হয়ে দাড়াবে।
৮) এদেশের কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের প্ররোচনা দিচ্ছে মায়ানমার না যেতে। এদের কেউ কেউ আবার তাদের আর্থিক এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে ফলে রোহিঙ্গাদের সরানোর ক্ষেত্রেও এটা একটা বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করছে। নিউজ টুডে’র বরাতে খবর রোহিঙ্গাদের “মুক্তি” নামক এক এনজিও ২৬৫৯ পিস চাপাতি দিয়েছে শুভেচ্ছা(!) স্বরূপ।
৯) গত দুই বৎসরে রোহিঙ্গাদের ভরনপোষনে সরকারে ব্যায় প্রায় বাহাত্তর হাজার কোটি টাকা।যা বাংলাদেশ সরকারের ২০০৮-২০১৩ মেয়াদের এক আর্থিক বৎসরের বাজেটের চেয়ে বেশী।

এবার সরকার এব্যাপারে কি কি পদক্ষেপ নিতে পারে তার উপর একটু আলোকপাত করা যাক।
১) প্রথমেই মায়নমারের সাথে এখনই সীমান্ত বন্ধ করে দিতে হবে অথবা সীমান্ত পাহারা দ্বিগুন করতে হবে। যাতে নতুন কোন অনুপ্রবেশ না ঘটে।
২)স্থানীয় দালাল চক্র যারা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটায় তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
৩)রোহিঙ্গাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিতে হবে এই বলে যে “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোন রোহিঙ্গা পরিবার বাচ্চা জন্ম দিতে পারবে না” আমরা এগারলাখ আশ্রয় দিয়েছি একচল্লিশ লাখ নয়।
৪)জরুরী ভিত্তিতে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবি সংস্থা , বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক সহ অন্যান্য যারা আছেন সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় কনভেনশনের ডাক দিতে হবে।
৫)আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিং আরো জোরদার করতে হবে।
৬) জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক কমিটি ছাড়াও নিরাপত্তা পরিষদেও বিষয়টি তোলা দরকার। তাদেরকে স্পষ্ট বোঝাতে হবে এটা একসময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। সুতরাং আর কালক্ষেপণ বাংলাদেশ মানতে পারতে পারবে না।
৭) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে ডেকে এনে বোঝাতে হবে যে এগার লাখের মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে সতের কোটির মানবাধিকার আমরা লংঘন করতে পারিনা।
৮)চীন এবং ভারতকে মায়ানমারের ব্যাপারে ভায়রা ভাই মনে হচ্ছে। তাদেরকে পরিষ্কার বলতে হবে কোনদেশে তাদের স্বার্থ বেশী। “বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ” এটা চলবে না।
৯) বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু দেশকে এব্যাপারে আরো সক্রিয় করার চেষ্টা করতে হবে। রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়াকে আমরা কাজে লাগাতে পারি কিনা ভেবে দেখা দরকার।
১০) দেশী বা বিদেশী এনজিও যারা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কাজ করছে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করছে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
১১) সবকিছুর উপরে দেশপ্রেম। জননেত্রী শেখ হাসিনা যে দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে অসহায় নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন সেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সকলকে একযোগে রোহিঙ্গাদের ফেরত দিতে সম্মিলিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।
আমি একজন সামান্য নাগরিক। অবশ্যই নিজেকে দেশপ্রেমিক ভাবি।দেশ নিয়ে চিন্তা করি।দিন শেষে দেশটা আমার।দেশ ভালো থাকলে আমি, আমরা সবাই ভালো থাকবো। আসুন দেশ নিয়ে, দেশের মঙ্গল নিয়ে ভাবি।

সফিকুর রহমান চৌধুরী টুটুল -জনপ্রতিনিধি ও ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্ট

About akdesk1

Check Also

ঈদের ৭ দিন আগে মহাসড়ক মেরামত সম্পন্নের নির্দেশ

যাত্রীদের নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ যাতায়াতে ঈদের ৭ দিন আগে মহাসড়ক মেরামতের কাজ শেষ করার নির্দেশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *