প্রচ্ছদ / মতামত / একজন মধ্যবিত্ত বাবা

একজন মধ্যবিত্ত বাবা

সফিকুর রহমান চৌধুরী:
সংসারে বাবা শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত।ছোটবেলায় বাবার কনিষ্ঠা আঙ্গুল ধরে বাংলাবাজারে যেতাম বাজার করতে।আব্বা কি কিনতো সেদিকে আমার খেয়াল থাকতোনা।আমার যাবতীয় মনোযোগ কেড়ে নিত রাস্তার পাশে বসা ঐ আইসক্রিমওয়ালা। কিভাবে সে লাল কাপড় পেঁচানো হাঁড়ির ভিতর থেকে একটা একটা সুস্বাদু কুলফি বের করে এনে দেয় আমি তা’ অবাক বিস্ময়ে দেখতাম আর আব্বার কাছে একটা কুলফী মালাইয়ের দাবী জানাতে থাকতাম।বাজার শেষ হলে অবশ্য অবশ্যম্ভাবীভাবে কুলফি একটা জুটতোও কপালে।কিন্তু বড়ভাইয়ের সাথে গেলে একটা বকা খেয়ে চুপ করে থাকতে হত গোমড়া মুখে। এতবড় অন্যায়ের নিরব প্রতিবাদ স্বরূপ ভাইয়ের হাত না ধরে রাস্তা দিয়ে একা একা হাটতাম।তবে আব্বার সাথে বাজার করার মজাই আলাদা।যা চাই তা’ পাই।এমন ছিল আমার আব্বা।
সর্বংসহা, দয়ালু, না বলতে না পারা, সাধাসিধে, উদার মনের একজন নিরহংকারী মানুষ। কারো সাতেও নাই পাঁচেও নাই।চাকুরীর দ্বায়িত্বটুকু শেষ হলেই আমাদের কাছে চলে আসতেন।মা’কে দেখেছি আব্বাকে ঝাড়ি মারতে, বকা দিতে। কিন্তু আব্বাকে কোনদিন দেখিনি শুধু মা কেন, কোন মানুষকেই জোরগলায় একটা কথা বলতে।বাবারা এমনই হয়।সামান্য একটু হয়তো এদিক সেদিক।তবে সংসারের ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত বাবাদের গলার আওয়াজ দিনদিন মিইয়ে যায়।তাঁরা শুধু জীবনকে বয়ে যেতে দেয়। জীবন যে উপভোগ করা যায় মধ্যবিত্ত বাবারা তা’ জানেই না।সময় কই জানবার?
আচ্ছা আব্বার শেষ জীবন যেমন কেটেছে আমার কি ওরকম কাটবে? আমরা ভাইবোন সবাই আব্বার কাছাকাছি থেকেছি।একটু অসুখ করলেই ঢাকায় ফোন। ওমনি আমাদের ছুটে যাওয়া। মৃত্যুর সময় আমরা আব্বাকে ঘিরে রেখেছিলাম। সবাই দোয়াদুরুদ পড়ছিলাম। আমার আব্বার মৃত্যু আমার দেখা সবচেয়ে বেহেশতি মৃত্যু। মৃত্যুর সময় আমাদের মনে হল আব্বা যেন পরম তৃপ্তি নিয়ে ঘুমাচ্ছেন। এভাবেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমার মৃত্যুর সময়কি আমার পরিবার ওরকম পাশে থাকবে?
একজন বাবা বৃদ্ধ বয়সে কতখানি একা হয়ে পড়ে তা ‘ কি আমরা বুঝি?
বিশেষ করে শহুরে বাবারা?
গ্রামে হয়তো আত্মীয় স্বজন থাকে, কিন্তু শহরে?
একজন বাবা সারাজীবন আয় করে সন্তান সন্ততি’র যাবতীয় চাহিদা পুরন করে স্ত্রীর নানা বায়না মিটাতে না পেরে
সারাজীবন এই কথা শোনে যে “তোমার ঘরে এসে আমার জীবনটাই বৃথা হয়ে গেল।কোনদিন আমার কোন আবদার তুমি পুরণ করতে পারলে না।”
নিজের কোঁচকানো শার্টের দিকে না তাকিয়ে বউয়ের জন্য দামী শাড়ি, ছেলেমেয়ের পছন্দের জামাকাপড় ইত্যাদি কিনবার পরে সামনের মাসে কিভাবে চলবে তা’ নিয়ে টেনশনে থাকেন
একজন মধ্যবিত্ত বাবা।কোন আনন্দ নিজের জন্য বরাদ্দ রাখেননা।পুরোনো জামা জুতো আরো পুরোনো হয়ে যায়, চুলে সাদার আবরন দেখা দেয় অকালেই, দাঁতেরও আর শক্তি থাকেনা আগের মতো। শরীরের বাঁধন আলগা হতে থাকে।হার্টের রক্ত সঞ্চালন ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পায়।ব্লাড প্রেশার বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে ব্লাড সুগারও।ক্রমান্বয়ে শক্ত সামর্থ্যবান একজন পুরুষ যে ছিল যৌবনে অনেকের আকাঙ্খিত সে যেন কেমন গোবেচারা হয়ে স্ত্রী সন্তানদের কাছে বেকুব বনে যায়। তার কথার কোন দাম থাকেনা স্ত্রী সন্তানদের কাছে।বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্ত্রীর চেয়ে বয়সের ব্যবধান বেশী থাকে সংসারের পুরুষের। সারাদিন আয় রোজগারের কাজে ব্যস্ত থাকার কারনে ছেলে মেয়েদেরও ঠিকমত সময় দিতে পারেননা তারা।তাছাড়া এত ব্যস্ততায় হয়তো মুখের ভাষাটাও কিছুটা রুক্ষ হয়ে যায়।সন্তানদের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে হয়।বউয়ের সাথে প্রথম জীবনের রোমান্টিক সম্পর্ক সময়ের প্রবাহমানতায় ধুলোময়লা জমে আস্তে আস্তে জং পড়ে যায়।ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনের মেলবন্ধন না হয়ে পক্ষ-বিপক্ষ এমন দু’টি দলে একটা অলিখিত ভাগ হয়ে যায় সংসার।মা’র দিকে ছেলে মেয়েদের পক্ষপাতিত্ব বেশীই থাকে।কারন ১) মা’ই বেশী সময় দিতে পারে ছেলেমেয়েদের এবং ২) তাদের অন্যায় আবদারেও মায়ের অন্ধ সমর্থন থাকে।
পরিবারের সবার চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে সংসারে বাবা অনেকটা একা হয়ে পড়ে। তা’র ক্ষমতা কতটুকু কেউ বুঝতে চায়না, বোঝার চেষ্টাও করে না।আবার দিনান্ত পরিশ্রম করে যে বাবা সকল কিছুর জ্বালানী যোগাড় করলো সেই বাবাই একসময় সবার কাছে অপাংক্তেয় হয়ে যায়।মা তা’র সময়গুলো মেয়ে ছেলে, ছেলের বউ সবার সাথে খুব সহজেই কাটাতে পারে।কিন্তু বাবা? কোথায় তার স্থান? কে তার কথা শোনে? কে তার বন্ধু ? দুঃখের কথা ভাগাভাগি করতে পারতো যা’র সাথে সেই প্রিয়তমা স্ত্রী কি জীবনের শেষ বেলায় এসে প্রিয়তমা থাকে? দেখিনাতো এমন। কিছু ব্যাতিক্রম অবশ্যই আছে।কিন্তু বাবাদের কষ্টের করুন বোবা আর্তনাদ আধুনিক সমাজের কারো কাছে পৌছে কিনা জানিনা।
নিজের জীবনের শেষ জ্বালানীটুকু দিয়ে যে বাবা উত্তরসুরীদের জীবন গাড়িকে সচল করে দিতে প্রানান্ত পরিশ্রম করেছে সেই বাবার স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে আর নিতান্ত সৌভাগ্যবান হলে ছেলের বাসার কোন এক অন্ধকার কোণে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবার এত কষ্ট করতেই হয়না।কারন সংসারের চাঁপে, অভাবের চাঁপে, সম্পর্কের নানামুখী চাপে বাবা বেচারা সবাইকে কক্ষপথে তুলে দিয়ে নিজে চলে যায় পরপারের অজানা আশ্রয়ে।
আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি কেন বাবাকে নিয়ে লিখছি?কারন বাবাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরুষ। বাবাদের নিয়ে কেউ লেখেনা।আমিও একজন বাবা।মধ্যবিত্ত বাবা।তাই বাবা নিয়েই আমার লেখা।আশা করি বাবারা আমার লেখাটা মনযোগ দিয়ে পড়বেন।পড়বেন ছেলেরাও এবং মেয়েরাও। যদি মনে হয় আমার লেখায় সারবস্তু কিছুটা আছে তাহলে আসুন
আমরা বাবাদের নিয়ে ভাবি।তাদের জন্য কিছু সময় সঞ্চয় করি।তাদেরও স্নেহ ফিরিয়ে দেই যেটা তারা আমাদের দিয়েছিল আমাদের ছেলেবেলায়।
আসুন স্নেহের ঋণ যত্নদিয়ে,শ্রদ্ধা দিয়ে,সঞ্চিত সময় থেকে কিছু খরচ করে পরিশোধ করি তা’ যতটুকু পারা যায়।
জগতের সব বাবারা সন্তানের ভালোবাসার সুশীতল ছায়ায় জীবন সায়াহ্নের শেষদিনগুলো ভালোভাবে কাটাক।
( সফিকুর রহমান চৌধুরী, চেয়ারম্যান , গোবরা ইউনিয়ন, গোপালগঞ্জ)

About arthonitee

Check Also

আমার ভাবনা : দুদক বনাম পুলিশ

নিয়ামুল হক রতন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব সম্ভবত ১২ জুন মহান সংসদে বলেছিলেন বড় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *