প্রচ্ছদ / মতামত / ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি ও স্থানীয় ছাত্রলীগ

ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি ও স্থানীয় ছাত্রলীগ

হৃদয় তালুকদার :

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া ছাত্র সংগঠন। গৌরব,ঐতিহ্য,সংগ্রাম ও সাফল্যের ৭১ টি বছর পার করেছে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠনটি। ১৯৪৮ সালের ৪ ঠা জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগ গঠন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ভাতৃপ্রতীম সংগঠন এটি।ছাত্ররাজনীতির এক দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ । আলোকদীপ্ত নেতৃত্বের ঝাণ্ডা হাতে নিয়েই পথচলা শুরু হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। শুরুতেই বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়েই যেতে হয়েছে এই ছাত্র সংগঠনটিকে। ১৯৫২ সালের ভাষা অান্দোলন,৬২ র শিক্ষা অান্দোলন,৬৬ র ৬ দফা,৬৯ র গণঅভ্যুত্থান, ৭০ র নির্বাচন সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

আদর্শ রাজনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে পড়ে ছাত্রলীগ।

বিদ্যার সঙ্গে বিনয়, শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা এই নীতিকে সামনে রেখে আজও ছাত্রলীগের এতগুলো বছর পথ পাড়ি দেয়ার প্রতিযোগীতা। কালের গতিতে সুনামের পাশাপাশি বদনামের ভাগীদারও হতে হয়েছিলো ছাত্রলীগকে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ডায়নামিক নেতৃত্ব তৈরি করে দিয়েছেন। অতীতের হৃত ঐতিহ্য ফেরাতে এবং যুগোপযোগী এবং গ্রহনযোগ্য ও চমকপ্রদ নেতৃত্ব গঠন করতে বর্তমান ছাত্রলীগের দুই কাণ্ডারী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানী অক্লান্ত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কর্মপরিকল্পনা এবং তৎপরতা অব্যহত থাকলে একটি ইতিবাচক ছাত্রলীগ তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগবেনা হয়তো। যেভাবে একটি ক্লিন ইমেজের ছাত্রলীগ গঠন করতে তারা উদ্যোগী এবং আন্তরিক হয়েছেন তাতে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তন ছাত্রলীগে প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য তৃণমুল পর্যায় অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ছাত্রলীগের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।একটি সঠিক নেতৃত্বই একটি দলের,একটি দেশের উত্তরণের সোপান। নেতৃত্ব কেন্দ্রীয়ভাবে যতটা সুসংগঠিত এবং সঠিক হওয়া প্রয়োজন ঠিক ততটাই তৃণমুল পর্যায়েও প্রয়োজন।

ছাত্রলীগের বিষয়ে তৃণমুলের নেতৃত্ব যে সবখানেই সঠিক রয়েছে তা নয়। অবহেলা এবং উপেক্ষার কারণে তৃণমুলে সঠিক নেতৃত্ব উঠে আসতে পারছেনা অনেক ইউনিটে।তার জন্য জেলা এবং উপজেলা কমিটি অনেকাংশে দায়ী। কারণ নেতৃত্ব তৃণমুল থেকেই যদি সঠিকভাবে না তৈরি হয় তবে জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেটি কুপ্রভাব ফেলে। জেলা কমিটি গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটির তত্বাবধানে আর উপজেলা কমিটি গঠিত হয় জেলা কমিটির তত্বাবধানে। সবশেষে থাকলো ইউনিয়ন কমিটি।উপজেলা কমিটির দ্বারাই ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু ইউনিয়ন কমিটিতে বা উপজেলা বা জেলাতেও যে নির্ভুল নেতৃত্ব আসে তা কিন্তু নয়।বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে অনেক ইউনিট চলছে।যার কারণেই ছাত্রলীগকে সমালোচনার ভাগী হতে হয়।বিশেষভাবে মাদক এর রাহুগ্রাসে সমাজ অাজ রসাতলে।দুঃখের বিষয় ছাত্রলীগেও মাদকের অনুপ্রবেশ।বিভিন্ন ইউনিটের সভাপতি/সম্পাদক মাদকাসক্ত!!কতটা ঘৃণার ব্যাপার। যদিও এসব থেকে অচিরেই মুক্তির পথে ছাত্রলীগ।কারণ বর্তমান ছাত্রলীগের দুই কাণ্ডারীই ব্র্যাণ্ড এ্যাম্বাসেডর ছাত্রলীগের জন্য।তাদের প্রচেষ্টা ও সাহসী নেতৃত্বে সমস্ত অশুভ রিপু দুর হবে এই প্রত্যাশাটুকু অন্তত করা যায়।ইউনিয়ন কমিটি কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।অথচ সেখানেই অবহেলা।

মাদক ও নেশার অনুপ্রবেশ এখানেও।

তৃণমুল পর্যায় থেকে যদি অাদর্শ ও সুসংগঠিত নেতৃত্ব তৈরি হয় তবে অদূর ভবিষ্যতের ছাত্রলীগ হবে পুর্বের যেকোন কমিটির থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুগঠিত।

ইতিবাচকতার ব্র্যাণ্ড এ্যাম্বাসেডর হিসেবে ছাত্রলীগকে পুনর্গঠিত করতে হলে অবশ্যই তৃণমুল কে গুরুত্ব দিতে হবে।

অবহেলার দৃষ্টি নিয়ে দেখলে কোন লক্ষ্যই অর্জন হবেনা।দেশের স্বার্থ জড়িয়ে অাছে এমন প্রতিটি অান্দোলন ও সংগ্রামে ছাত্রলীগ সমর্থন,অংশগ্রহন ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে এসেছে।অাপামর ছাত্রসমাজের অধিকার অাদায়ে ছাত্রলীগ বদ্ধপরিকর।কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় সেই ছাত্রলীগকে অনেক সময় ইমেজ সংকটে পড়তে হয়।এটা কিন্তু পুরো জাতিকেই হতাশ করে।ছাত্রসমাজকে তো করেই।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তো দলকে পরিচালিত করবেই কিন্তু তৃণমুল হচ্ছে দলের প্রাণ।সেখানে সঠিক নেতৃত্ব না অানতে পারাটা চরম ব্যর্থতা।তাই স্থানীয় রাজনৈতিক গতি কে অবশ্যই ধারাবাহিকতা ও চলমান রাখার বিকল্প নেই।জেলা কমিটি যদি সুসংগঠিত হয় তবে অবশ্যই উপজেলা কমিটি সুসংগঠিত হবে।অার উপজেলা কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নে সুসংগঠিত নেতৃত্ব তৈরি করবে।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে অানা,মাদকাসক্তকে প্রশ্রয় ও পদ পদবী দেয়া,অনুপ্রবেশকারীদের স্থান দেয়া,অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে অাসার মতো নজীর রয়েছে।এই জায়গাটি থেকে ছাত্রলীগকে বের হয়ে অাসতে হবে।স্থানীয় কমিটিগুলোতে এই ধরণের ঘটনাগুলো প্রায়ই ঘটছে।যার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে গিয়ে পড়ছে।তিল থেকেই তালের সৃষ্টি হচ্ছে।অপরাধ কোথাও হলেই মিডিয়াগুলোতে ফলাও করে ছাত্রলীগের নাম প্রচারিত হতে থাকে।যার ফলে যা হবার তাই হয়।সাধারণ ছাত্র ও মানুষের মাঝে ছাত্ররাজনীতিকেই নেতিবাচক বলে গণ্য করা হচ্ছে।মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।যার কারণে গোটা ছাত্ররাজনীতির দিকে যখন তখন অভিযোগের অাঙ্গুল ওঠে।

অান্দোলন,সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ছাত্রলীগের মতো সংগঠন গড়ে উঠেছে।তাই এই সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে হবে সংগ্রাম করেই।অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির ধারক হয়ে লড়তে হবে ছাত্রলীগকে।

শিক্ষা শান্তি ও প্রগতির পতাকবাহী এই সংগঠন ভবিষ্যতের বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতির অারেক পুনর্জন্ম দেবে এটা শুধু প্রত্যাশারই বিষয় নয় রীতিমতো কাম্যও।ছাত্ররাই জাতির অাগামি দিনের কর্ণধার,দেশের ভবিষ্যৎ।অার সেই জায়গা থেকেই ছাত্রলীগের উৎপত্তি।

সম্প্রতি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে যে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে তা সত্যিই দুঃখজনক।দায় এড়ানো সম্ভব নয়। কমিটি যদি বিতর্কিত হয়ে থাকে তবে সেখানে প্রতিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক।প্রতিবাদ হতেই পারে কিন্তুসেটাও অবশ্যই হতে গণতান্ত্রিক ও মার্জিত ভাষায়।বিশৃঙ্খলা কোন প্রতিবাদের ভাষা নয়।হাতাহাতি,মারামারি কোন সমস্যার সমাধান নয়।যদিও এই সমস্যা সমাধানের জন্য কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আশাকরি সঠিক সমাধানই আসবে। যোগ্যরা পদ পাবেন।

অনিয়মের ধারাবাহিকতা রক্ষা হচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে এমন ধারণা করা খুব একটা ভুল কিছু হবেনা সাধারণ মানুষের। একে তো জেলা,উপজেলা, ইউনিয়নে গঠনতন্ত্র অবমাননা করা হচ্ছেই তার উপর যদি কেন্দ্রে অনিয়ম হয়,তার প্রতিবাদ হিসেবে হট্টগোল হয় তাহলে ছাত্রলীগ এ যারা কর্মী হিসেবে রয়েছেন তারা আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে পাবেন?

ত্যাগী,দুর্দিনে দলের কাণ্ডারী,সঠিক নেতৃত্বদানকারী অনেক ছাত্রনেতারাই পদবঞ্চিত হচ্ছেন এমন অভিযোগ নতুন নয়। আমদানিকৃত নেতা,অন্য দল থেকে এসে যোগদান করা,নেশাগ্রস্ত,অছাত্রদের বড় বড় পদ দেবার নজীর ছাত্রলীগে অাছে এটা অস্বীকার করবার কিছুই নেই।

শুধুমাত্র সঠিক নজরদারীর অভাবেই এমনটি হয়ে থাকে। প্রতিটি ইউনিটে যদি কড়া নজরদারী রাখা যায় তবে অনিয়ম হবার কোন সুযোগ থাকেনা। জেলা কমিটি উপজেলা কমিটি দিয়েই যদি শান্ত থাকে তবে ইউনিয়ন কমিটি একচেটিয়া ভাবে উপজেলা কমিটির প্রভাবে থাকে। উপজেলা কমিটি কর্তৃক যাকে খুশি তাকেই পদ দেবার সুযোগ তৈরি হয়ে যায়।

ব্যক্তি দেখে নয়,কার্যকলাপ দেখে,নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা দেখে,দলের প্রতি আনুগত্য দেখেই মুল্যায়ন করার নিয়ম।কিন্তু সেটা কতটুকু সম্ভব হচ্ছে?

হতাশার অন্ধকারে অার যোগ্যদের পদবঞ্চিতদের দীর্ঘশ্বাসে যেন ডুবে যাচ্ছে তৃণমুল ছাত্রলীগ।

স্থানীয় প্রভাবশালীরাও অনধিকার চর্চা করেন ছাত্রলীগের কমিটিতে।কোথাও সম্মেলন হলে নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের লবিং এ দলের কাউন্সিলর ও নীতিনির্ধারকেরা বিভ্রান্তির মাঝে পড়ে যান।অমুকের অমুক প্রার্থী,তমুকের তমুক প্রার্থী।দলীয় প্রোগ্রামে যাদের ছায়াটি পর্যন্ত দেখা যায় না সম্মেলন এলেই তারা প্রার্থী হয়ে যান।লবিং করার প্রবণতা দেখে মনে হয় কেউ যেন ছাত্রলীগের প্রার্থী নয়,বিভিন্ন ব্যক্তির পছন্দের প্রার্থী।

ছাত্রলীগ কি?এর গঠনতন্ত্র কি?এর পটভুমি কি? অনেক নেতারাই জানেনা আমি নিশ্চিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এরাই হয় ছাত্রলীগের সভাপতি/সম্পাদক।

ছাত্রলীগ লজ্জিত তখনই হয় যখন বিতর্কিত এবং অছাত্ররা এসে ছাত্রলীগের পদ পায়।এই লজ্জা শুধু ছাত্রলীগের ই নয় এই লজ্জা গোটা জাতির।কারণ প্রগতির পতাকাবাহী এই ছাত্রলীগের কাছ থেকে জাতি সবসময়ই ইতিবাচক কিছু প্রত্যাশা করে থাকে।

ছাত্রলীগ মানে শিক্ষা,ছাত্রলীগ মানে শান্তি,ছাত্রলীগ মানে প্রগতি।

ছাত্রলীগ সবসময় কলমের শক্তিতে বিশ্বাসী। ন্যায় এবং নীতিতে অবিচল। সেই ছাত্রলীগ কেন বিতর্কিত হতে যাবে? কেন???

সঠিক নেতৃত্ব অতীতেও গড়ে উঠেছিলো ছাত্রলীগ থেকে। দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ছিলো দুর্জয় কাণ্ডারীর মতো। তবে আজ এত প্রশ্ন কেন? আজ এত অভিযোগ কেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজেও ছাত্রলীগ করেছেন।ছাত্রলীগের সঙ্গে তারও অাবেগ জড়িয়ে অাছে।ছাত্রলীগের অাবেগ ছাত্রলীগ ই অনুধাবন করতে পারে।তাই সমাধানও ছাত্রলীগের কাছেই।

আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন অনেক নেতা ছাত্রলীগ করে নেতৃত্বে এসেছেন।

তাই ছাত্রলীগ একটি উদীয়মান সুর্য।

অন্ধকারের অমানিশা কেটে ছাত্রলীগ চারিদিক আলোকিত করবে এমন প্রত্যাশা আমাদের, এমন প্রত্যাশা জাতির।সংকট কাটিয়ে ছাত্রলীগ আবারো অকুলে পাড়ি জমাবে এটাই প্রত্যাশা।

জয় হোক ছাত্রলীগের। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পুর্ন প্রতিফলন ঘটুক ছাত্রলীগে।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

About arthonitee

Check Also

একজন মধ্যবিত্ত বাবা

সফিকুর রহমান চৌধুরী: সংসারে বাবা শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত।ছোটবেলায় বাবার কনিষ্ঠা আঙ্গুল ধরে বাংলাবাজারে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *