প্রচ্ছদ / মতামত / কেন পরিবর্তন নয়

কেন পরিবর্তন নয়

হৃদয় তালুকদার: 

দুর্নীতি, অনিয়ম বাংলাদেশের ইস্যুতে নতুন কোন বিষয় নয়।ছোট থেকে বড় প্রতিটি খাতেই চলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। খাত ছোট হোক বা বড় গুরুত্বপূর্ণ তো অবশ্যই। বেসরকারী খাত এর হিসাব টা না হয় নাই করলাম কিন্তু সরকারী খাতগুলো তে যে হারে লুটতরাজ, অনিয়মের পাহাড় গড়ে উঠেছে তা তো বলার অপেক্ষা রাখেনা।আমরা এগিয়ে যাবো কিভাবে এত অনিয়ম হলে?
দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টার ত্রুটি নেই। হতদরিদ্র নামটি মুছে ফেলতে সরকার কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহন করেছে। কিছু প্রকল্প হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়িত করেছে।কিন্তু দুর্নীতির কালো হাতের থাবা সেখানেও। পিছু ছাড়েনি সেখানেও।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যতা একটি জাতির জন্য অবশ্যই লজ্জার। তাই সরকার সেটার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে ক্ষুধামুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে উদ্যোগী হয়েছে।নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
হতদরিদ্র পরিবারের জন্য সরকার তার সাধ্যমতো খাদ্য যোগানের কর্মসূচি গ্রহন করেছে। তার মধ্যে একটি হলো ১০ টাকা কেজি দরে চাল। এই খাতে অতি দরিদ্র পরিবার বছরে পাচবার ৩০ কেজি করে চাল পাবে। আরেকটি কর্মসূচি হলো রেশনিং সিস্টেমে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রতি মাসে হতদরিদ্র পরিবার বিনামুল্যে চাল পাবে। যার মেয়াদ টানা দুবছর। অর্থাৎ প্রতিটি উপকারভোগী একটানা দুবছর বিনামূল্যে ৩০ কেজি করে চাল পাবে।তার মেয়াদ শেষ হলে তার স্থলে নতুন কেউ যুক্ত হবেন এবং অবশ্যই তাকে হতদরিদ্র হতে হবে। এটি হলো নিয়মের কথা।

কিন্তু বাস্তবতা কি বলে? আদৌ কি সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবে রুপ পাচ্ছে? হতদরিদ্ররা সরকারের অনুদান গ্রহন করতে পারছেন? পারছেন না। কারণ দুর্নীতির রাহুগ্রাস এখানেও। অনিয়মের বেড়াজাল ভাঙেনি এখানেও।
খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি র অওতায় হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কিন্তু সঠিক নিয়মে হচ্ছেনা। দুর্নীতির একটি বড় সুযোগ এই খাতে নেয়া হয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান,মেম্বার ও তথাকথিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের দ্বারা। কারণ মেম্বার,চেয়ারম্যান এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাই যাচাই বাছাই কমিটির দায়িত্বে থাকেন এবং দরিদ্রদের মাঝে উপকারভোগীর তালিকা প্রণয়ন করেন এবং সেটাই চুড়ান্ত করা হয় তারা যাদেরকে নিয়ে তালিকা তৈরি করেন। তারা স্বাধীনভাবে দরিদ্র ব্যক্তিদের পাশাপাশি স্বচ্ছলদেরকেও এর অওতায় ফেলে দেন এবং দরিদ্রদের বঞ্চিত করেন।অর্থাৎ প্রকৃত দরিদ্ররা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।এই চালগুলো বিতরণ হয় ডিলার কর্তৃক। ডিলারদেরও দুর্নীতি করার সুযোগ থাকে এই ক্ষেত্রে।তারা ওজনে সঠিক দেয়না অনেকেই।ধরার কেউ নেই,বলার কেউ নেই। এতো গেলো একটি ধাপ।

অন্য ধাপটি হলো রেশনিং সিস্টেম। এখানেও একচেটিয়া অনিয়ম। এটার সুযোগ গ্রহন করেন মেম্বার, চেয়ারম্যানেরা।তারাও সুযোগ বুঝে দরিদ্রদের বঞ্চিত করছেন একচেটিয়াভাবে। টাকার বিনিময়ে স্বচ্ছলদেরকে সুযোগ করে দেন তারা।ফলাফল যা হবার তাই ই হচ্ছে। সরকারের অনুদান দরিদ্রদের কাছে পৌছাচ্ছেনা। এর জন্য স্বয়ং সরকারী ব্যবস্থাপনাই দায়ী। কেন সরকার এই বিষয়গুলোর প্রতি মনিটরিং করছেনা? কড়া নজরদারী থাকলে এত সর্বনাশ হতোনা। দরিদ্ররা বঞ্চিত হতোনা।
সরকার এসব প্রকল্পগুলোর প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক কিন্তু নজরদারীর ব্যাপারে গাফলাতি করছে। তাই সুনামের পরিবর্তে দুর্নামই হচ্ছে। হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের এই উদ্যোগকে ছোট করে দেখবার কিছু নেই। বরং এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসুচী। দেশের এগিয়ে যাবার পথে এক বিশাল সাপোর্ট। আমরা যত অনাহারে থাকবো দেশ ততই পিছাবে। ক্ষুধা দুর হলেই আমরা কাজ করার শক্তি পাই। তাই অবহেলার জিনিস এটা নয়।গুরুত্ব দেবার বিষয় অবশ্যই।

অনিয়মের পাহাড় কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোও। কমিউনিটি ক্লিনিক তো গরীবের জন্য আশীর্বাদ। বিনামুল্যে অনেক রকমের ওষুধ দেয় সরকার। কিন্তু কর্মরত ডাক্তার রা বেশ অবহেলা করে তাদের দায়িত্ব। ঠিকমতো ক্লিনিকে না উপস্থিত থাকা তো নিয়মিত ব্যাপার। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে যারা দায়িত্বে থাকেন তারা তো রীতিমতো অফিস কামাই করেন। এসব জিনিসের প্রতি সরকারের মনিটরিং কোথায়?
থাকলেও তার প্রতিফলন নেই।নইলে অনেকেই চাকুরীচ্যুত হতেন। কিন্তু যারা বঞ্চিত হবার তারাই হচ্ছেন।দায়িত্বে অবহেলাকারীদের কিছুই হয়না।
এইভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে সরকারের প্রকল্পগুলো ভেস্তে যেতে কদিন লাগবে?
যে উদ্দেশ্য কে সামনে রেখে এইসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তার একটিও বাস্তবায়িত হবেনা। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর সাথে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।কিন্তু বিশাল একটি অংশকে বঞ্চিত রেখে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার থেকে পরাজয় স্বীকার করে নেয়াটাই শ্রেয়।
কড়া নজরদারী এবং সুনির্ধারিত অাইনের প্রয়োগের অভাবেই আজ এই করুণ পরিস্থিতি।কাজের সঠিক মনিটরিং থাকলে এমনটি হবার কথা নয়।মেম্বার চেয়ারম্যানরা ঠিকমতো সবকিছু করছে কিনা,হতদরিদ্ররা বঞ্চিত হচ্ছে কিনা,ভাতা প্রদানে অনিয়ম হচ্ছে কিনা,প্রতিবন্ধীরা সুবিধা কতটুকু পাচ্ছে এসব তদারকি করার জন্য সরকার কেন উদ্যোগী হচ্ছেনা?
নিরাপত্তা সরকারকেই দিতে হবে। সুযোগ সন্ধানী মানুষ সুযোগ নিবেই। দুর্নীতি করার প্রবণতা তো রয়েছেই। তাহলে সরকার এলার্ট না হলে লক্ষ্য অর্জন হবে কি করে? টি আর,কাবিখা,কাবিটা এসবেও দুর্নীতি পান্তভাতের মতো। তাই সঠিক মনিটরিং না করলে দুর্নীতির পাগলা ঘোড়া শুধু চলবেই না।জোর গতিতে দৌড়াবে।

সরকারী অনুদান ঠিকমতো বিলি করা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।কিন্তু তারা পুরাই উদাসীন সেই ব্যাপারে। তাই প্রচলিত ও গতানুগতিক নিয়মনীতিতে অবশ্যই পরিবর্তন অাসা উচিত।অবশ্যই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সঠিকভাবে যাতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে সেই ব্যাপারে সরকারের কড়া নজরদারী ও আন্তরিকতা অবশ্যম্ভাবী। তবেই আমরা লক্ষ্য পুরণে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যেতে পারবো।
প্রতিটি স্তরে যেসব বিষয় দেশের উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত সব জায়গাতেই পরিবর্তিত নিয়ম চালু হওয়া জরুরী।পিছিয়ে নয় এগিয়ে যাবার পথে বাংলাদেশ।তাই পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয়।

About arthonitee

Check Also

ইচ্ছা পূরণ আবাসনে বদলে গেছে ১৩ শিশুর জীবন

সকালে ঘুম থেকে উঠেই যে শিশুটি ভিক্ষা করতে যেত সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে, সে এখন প্রতিদিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *