প্রচ্ছদ / মতামত / বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীবাদ ও একজন ত্যাক্ত পাঠক

বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীবাদ ও একজন ত্যাক্ত পাঠক

ড. শাহ মোহাম্মাদ সানাউল হক:
নারীর অধিকার নিয়ে সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতিতে আলোচনা বহু পুরাতন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৪৮ সনে নিউইয়র্কের সেনেকা ফলসে তিনশত পুরুষ ও নারীর একটা সমাবেশে উচ্চারিত হয়েছিলোঃ“We are assembled to protest against a form of government, existing without the consent of the governed—to declare our right to be free as man is free, to be represented in the government which we are taxed to support, to have such disgraceful laws as give man the power to chastise and imprison his wife, to take the wages which she earns, the property which she inherits, and, in case of separation, the children of her love.”

সে সুবাদে, ঊনিশ ও বিশ শতকের প্রথমাংশে সমাজে নারীর অধিকার (সম্পত্তির, চুক্তির), বিশেষতঃ ভোটাধিকার নিয়ে আলোচনা ও আন্দোলন নারীবাদের প্রথম তরঙ্গ।

দ্বিতীয় তরঙ্গটি ১৯৬০-৯০ এর দশকের। যুদ্ধবিরোধী, নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান স্ব-সচেতনতার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় তরঙ্গে পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় সংবিধানে নারীর প্রতি বৈষম্য, যৌন ও প্রজনন বঞ্চনা, ইত্যাদি বিষয় প্রধান উপজীব্য ছিলো। এসময়েই লিঙ্গ বৈষম্যের বায়োলজিকেল ও সামাজিক চেতনার পার্থক্য নির্ণিত হয়।

নব্বই দশকের শেষদিকে উত্তর-উপনিবেশবাদ ও উত্তর-আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে সমস্যার বহুমাত্রিক অনুসন্ধান নিয়ে নারীবাদের তৃতীয় তরঙ্গ। এটি অনেকটা নারীবাদের পূর্বতরঙ্গের দুর্বলতার পরিপ্রেক্ষিতে নারীবাদের ভেতরেই নারীবাদের আন্দোলন। এখানে যৌন ও প্রজনন অধিকারের পাশাপাশি সংখ্যলঘু সম্প্রদায়, নৃগোষ্ঠি, নারীবান্ধব বাজেট, ধর্মীয়, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকূলতা, ইত্যাদি প্রাধান্য পায়।

একবিংশ শতাব্দীকে কেউ কেউ নারীবাদ আন্দোলনের চতুর্থ তরঙ্গ হিসাবে দেখতে চান। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ সুবিধার প্রেক্ষাপটে এ পর্যায়ে নারীবাদ বিষয়টি গণ-আলোচনায় স্থান পেয়েছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে; পাশাপাশি নতুন ও খুটিনা্টি বিষয়বস্তু বা সমস্যা চিহ্নিত হচ্ছে। যেমনঃ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব, সমস্যার কন্টেক্সটুয়ালা‌ইজেশন, সহিংসতা, ধর্ষণ, অসম পারশ্রমিক, নারীর গতানুগতিক কাজের আর্থিক মূল্য, মাতৃত্বকালীন অধিকার ও সুবিধাদি, গৃহাস্থলী কর্মবিভক্তি, বিজ্ঞাপণ বা মিডিয়ায় নারীর উপস্থাপন, স্টেরিওটাইপিং, গ্লাস সিলিং, ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন, ইত্যাদি। এমনকি উত্তর-নারীবাদ আলোচনা ব্যাপকতা পাচ্ছে। নারীবাদের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও, এ পর্যায়ে বিভিন্ন প্লাটফর্মে তৃতীয় লিঙ্গ, লিঙ্গ পরিবর্তন, সমকাম, একই লিঙ্গের মধ্যে বিয়ের অধিকার, ইত্যাদি সমান্তরালভাবে জোর পেতে শুরু করে। প্রতি মূহুর্তে লক্ষ মানুষ পৃথিবীব্যাপি সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব বিচিত্র বিষয় তুলে ধরছেন।

বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীবাদ নিয়ে লেখাগুলো আমাকে আকৃষ্ট করে। কিছু লেখা একনজরে দেখে নিই। কিছু লেখা সত্যিই সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক ও গভীর, কিংবা নতুন মাত্রার ইঙ্গিত দেয়; -ওগুলো মনযোগ দিয়ে না পড়ে পারি না। যেগুলো দেখি সেগুলো এবং যেগুলো পড়ি সেগুলো- দুটোকেই শ্রদ্ধা জানাই, উৎসাহিত করি।

যাঁরা লিখেন তাঁদের কারো কারো উদ্দেশ্যে, একজন প্রোফেমিনিস্ট পাঠক হিসাবে দুটি উপলব্ধি জানানোই উপরের দীর্ঘ ভূমিকার কারণঃ

(ক) গঁতবাঁধা একটি বিষয় নিয়ে চর্বিতচর্বন না করে সমাধান নিয়ে কথা বলুন, প্লিজ!

(খ) যদি সমস্যা নিয়েই কথা বলতে চান তবে সমস্যার নতুন কোনো তথ্য বা এঙ্গেল, স্থানীয় আঙ্গিক বা উদাহরণ তুলে ধরুন।

(গ) না হলে, যতো ক্ষুদ্রই হোক, নিজ গণ্ডিতে নারীর অধিকার সংরক্ষণে বা বৈষম্য রোধে কিছু একটা বাস্তব উদ্যোগ নিন ও প্রচার করুন।

(ঘ) তা না হলে, যাঁরা ভালো লিখছেন তাঁদেরটা বেশি করে পড়ুন, প্রতিক্রিয়া জানান। (আমি এই শ্রেণির )

(ঙ) অশ্রাব্য শব্দ বা অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের সাথে নারীবাদ নিয়ে আলোচনা বা আন্দোলন কিংবা প্রগতিশীলতার সম্পর্ক নাই বরং এতে লেখকের এক ধরণের উদ্ভট মানসিকতার প্রকাশ ঘটে।

( ড. শাহ মোহাম্মাদ সানাউল হক এর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া )

About arthonitee

Check Also

ইচ্ছা পূরণ আবাসনে বদলে গেছে ১৩ শিশুর জীবন

সকালে ঘুম থেকে উঠেই যে শিশুটি ভিক্ষা করতে যেত সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে, সে এখন প্রতিদিন …