প্রচ্ছদ / প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর / মুন্সীগঞ্জে উত্তাপ-উত্তেজনায় উপজেলা নির্বাচন

মুন্সীগঞ্জে উত্তাপ-উত্তেজনায় উপজেলা নির্বাচন

মোঃ নাজমুল ইসলাম পিন্টু(মুন্সীগঞ্জ) :
মুন্সীগঞ্জ জেলার ছয়টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে উত্তাপ-উত্তেজনা বিরাজ করছে। চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক পাবার আশায় কেন্দ্রে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। ছয়টি উপজেলায় জেলা আওয়ামী লীগ কাউন্সিল করে তৃণমূলের মতামত নিয়ে প্রার্থী সিলেকশন করে কেন্দ্রে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন।

তবে, কেউ কেউ জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলকে একতরফা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ করেছেন। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে শ্রীনগর উপজেলা বাদে জেলার অপর পাঁচটি উপজেলায় জবরদস্তি করে জয়ী হয়ে চেয়ারে বসেন প্রার্থীরা। আগামী নির্বাচনে জেলার ছয়টি উপজেলায়ই নৌকার সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভোটাররা।

গত উপজেলা নির্বাচনে শ্রীনগর উপজেলায় চেয়ারম্যানসহ তিনটি পদেই বিএনপির প্রার্থীরা জয় পায়।

২০১৪ সালের ২৩ মার্চ গজারিয়া উপজেলা নির্বাচনে রক্ত আর লাশের ওপর দিয়ে ক্ষমতার চেয়ার দখল করেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা। ওই নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেন ও তার বাহিনীকে ভাড়া করে আনা হয় গজারিয়ায়। শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা। নির্বাচনের দিন ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগ প্রার্থী আমিরুল ইসলাম পক্ষের বালুয়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি আওয়ামী লীগ সভাপতি শামসুদ্দিন প্রধান (৪৮) কে গুলি করে হত্যা করা হয়।

একই দিন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও বাউশিয়া ইউনিয়নের ওই সময়ের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মনার স্ত্রী লাকি আক্তার (৩৮) গুলিবিদ্ধ হয়ে পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ওই বছরের ২৭ মার্চ ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে মৃত্যুরবণ করেন। নির্বাচনের পর দিন ২৪ মার্চ উপজেলা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক মাহবুব আলম জোটন প্রধান (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে একই দিন সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। নির্বাচনের আগের দিন ২২ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গজারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান দেওয়ান (৫৫) ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বীর বিক্রম (৬০) কে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে তোতা বাহিনী। এমনকি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও ভাঙচুর করে তারা। ওই নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ভয়-আতঙ্কে এলাকার শত শত নারী-পুরুষ গ্রাম ছাড়ে।

নির্বাচনী সহিংসতা, বিভিন্ন কেন্দ্রে গোলযোগের কারণে উপজেলার ৯টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে একই বছরের ৯ এপ্রিল স্থগিত নয়টি ভোটকেন্দ্রের পুনঃনির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা নির্বাচিত হন।

এসব ঘটনায় মুন্সীগঞ্জর তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান ও গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মামুন-অর রশীদকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এ কারণে আগামী নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

এদিকে, নির্বাচন নিয়ে কোন তোড়জোড় নেই স্থানীয় বিএনপির মধ্যে।

এদিকে, গত মাসে ছয় উপজেলায় চেয়ারম্যান ও দুটি ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রায় ১২৬ জনের কাছে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে জেলা আওয়ামী লীগ।

মুন্সীগঞ্জ সদর:
এই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি বর্তমান চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিছ-উজ্জামান আনিছ। একই পদে প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহতাবউদ্দিন কল্লোল। আছেন সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মনছুর আহামেদ কালাম।

এছাড়াও, বালুদস্যু ও বির্তকিত আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হওয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান রয়েছেন। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মাওলা তপনসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হওয়া জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুন্নাহার শিল্পী, অ্যাডভোকেট সালমা ও বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান শামসুন্নাহার নাজমা রয়েছেন।

গজারিয়া:
তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম। তিনি পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচিত। প্রার্থী তালিকায় আরও রয়েছেন, বর্তমান চেয়ারম্যান রেফায়েতউল্লাহ খান তোতা, ইমামপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনছুর আহম্মেদ জিন্নাহ।

ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আতাউর রহমান খোকন নেকি, আসিফ চৌধুরী অরেঞ্জ, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান আশাদুজ্জামান আশাদ।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন, জেলা জাসাসের সাবেক সহ সভাপতি বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ফরিদা ইয়াসমিন, উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক সুরাইয়া বেগম, যুগ্ম আহ্বায়ক আখি আক্তার।

টঙ্গিবাড়ী:
পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ এনে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান জগলুল হালদার ভুতু জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল বয়কট করেন। এতে বর্তমান চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদের নাম এককভাবে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন কেন্দ্রে পাঠান। পরবর্তীতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমান জগলুল হালদার ভুতুসহ তিনজনের নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে আরেকটি চিঠি পাঠান। এসব ঘটনায় চেয়ারম্যান প্রার্থী জগলুল হালদার ভুতু কেন্দ্রে একটি লিখিত অভিযোগও করেন।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সর্বোচ্চ ভোটে প্রথম হয়েছেন বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান এমিলি পারভীন। পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে রাহাত রুবেল খান তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছেন। এছাড়াও প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন আতিকুর রহমান শিল্পী।

লৌহজং:
চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওসমান গণি তালুকদার। এছাড়াও প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আবুল বাসার।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন, বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বেপারী, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নিপু ফকির।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন, রিনা ইসলাম ও সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রানু আক্তার।

শ্রীনগর:
শ্রীনগর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছেন জেলা যুবলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান মামুন। এছাড়াও কাছাকাছি ভোট পেয়ে প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন, কেন্দ্রীয় যুবলীগ উপ-কমিটির সহ সম্পাদক জাকির হোসেন, শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে এগিয়ে আছেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান জিঠু। এছাড়াও প্রাথী তালিকায় আছেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি জহিরুল হক নিশাত শিকদার, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি শেখ মো. আলমগীর।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন, মহিলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি রেহেনা বেগম, সহ সভাপতি আছিয়া আক্তার রুমু, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সোহেলা পারভীন রানুসহ আরও কয়েকজন।

সিরাজদিখান:
তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যন মো. মহিউদ্দিন আহাম্মেদ। এছাড়াও প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক মো. আবু বকর সিদ্দিক।

ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন, বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মঈনুল হাসান নাহিদ। নাহিদ কাউন্সিলে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছেন।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন, বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান হেলেনা ইয়াসমিন ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাহমিনা আক্তার তুহিন।

About arthonitee

Check Also

চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সাভারে অটোরিকশা চালকদের অবস্থান ধর্মঘট

সাভার থেকে শামীম আহমেদ ঢাকার সাভারে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে অটোরিকশা চালকেরা অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *