প্রচ্ছদ / প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর / মুন্সীগঞ্জের সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলো পরিবেশ বিধি মানছে না

মুন্সীগঞ্জের সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলো পরিবেশ বিধি মানছে না

মোঃ নাজমুল ইসলাম পিন্টু (মুন্সীগঞ্জ):

মুন্সীগঞ্জে পরিবেশ দুষন ও ফুসফুসে ক্যান্সারের জন্য দায়ী সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলো। আইন অনুযায়ী বায়ুতে ভাসমান বস্তুর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২০০ পিপিএম। কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার ধূলিকণা বায়ুতে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিমেন্ট কারখানাগুলো। কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে তা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে শত গুণেরও বেশি। নেই ধূলা প্রতিরোধক ব্যবস্থা। প্রাথমিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করছেন শ্রমিকরা। এতে ক্লিংকারের গুঁড়া, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ, মাটিতে থাকা ধূলিকণা ও পারদ মিশে যাচ্ছে বায়ুতে। মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে পরিবেশের।

পরিবেশ আইন মানচ্ছে না সিমেন্ট কারাখানা গুলো। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাগজে কলমে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড় পত্র সহ সব কিছু ঠিক থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বাস্তব চিত্র তার উল্টোটা। রপ্তানীমুখী কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ম মানলেও অন্যান্যরা ক্ষমতার প্রভাবে দিব্যি নিয়ম ভাঙছে অবিরত।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, সিমেন্ট কারখানাগুলোয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বায়ু দূষণ কমিয়ে আনা সম্ভব। অন্যদিকে উৎপাদনকারীরা বলছে, ধূলিকণা নির্দিষ্ট মাত্রায় নামিয়ে আনার কোনো প্রযুক্তি নেই। উল্টো গ্রহণযোগ্য মান মাত্রা ২০০ পিপিএমের চেয়ে বাড়ানো প্রয়োজন বলে দাবি করেন তারা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল মামুন জানান, ২০১০ সাল থেকে সিমেন্ট কারখানাগুলো নজরদারিতে আনে পরিবেশ অধিদপ্তর। বায়ুদূষণে ক্ষতি করায় মুন্সীগঞ্জের এমআই সিমেন্ট (ক্রাউন সিমেন্ট) ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানার আশপাশে ধূলিকণার মাত্রা পাওয়া যায় ১ হাজার ১১২ দশমিক ৯১ পিপিএম যা গ্রহণীয় মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয় ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া কারখানার আশপাশে ৩৪০ পিপিএম ধূলিকণার উপস্থিতি পেয়ে মেট্রোসেম সিমেন্ট লিমিটেডকেও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ৪০০ পিপিএম মাত্রার ধূলিকণা পাওয়ায় এমিরেটস বাংলাদেশ সিমেন্টকে জরিমানা করা হয় ১৪ লাখ টাকা। একইভাবে শাহ সিমেন্টকে ২৭ লাখ টাকা করে ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট লিমিটেডকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এসব প্রতিষ্ঠান গুলোকে জরিমানা করা হলেও বায়ুর মান বজায় রাখতে সব কারখানাই ব্যর্থ বলে স্বীকার করেছে মালিকপক্ষ। জানতে চাইলে মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মুহাম্মদ শহিদউল্লাহ জানান, ‘কোনো সিমেন্ট কারখানাই ভাসমান বস্তু ২০০ পিপিএমের মধ্যে রাখতে পারছে না। প্রযুক্তি না থাকায় কোনো দেশই তা পারে না। হয় প্রযুক্তি দেন, আমরা তা আমরা গ্রহণ করব। নয়তো গ্রহণযোগ্য মাত্রা বাড়িয়ে ৫০০ পিপিএম করা হোক। বারবার জরিমানা করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এটা এক ধরনের হয়রানি।’

সিমেন্ট কারখানার ক্ষতিকর ধূলিকণা বায়ুর মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে মেশে। বিভিন্ন কাঁচামাল মিশ্রণের ফলে সিমেন্ট তৈরি হয়। তাই এসব ধূলিকণা বিষাক্ত হয়ে থাকে। আশপাশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র, কৃষিজমি ও ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করে। গ্রহণযোগ্য মাত্রা অতিক্রম করে পরিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করা হয়েছে, আইন অনুযায়ী কারখানাগুলোকে সে পরিমাণই জরিমানা করা হয়েছে।

সরেজমিনে নির্মাণ প্রক্রিয়া পর্যাবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রতিদিন কারখানাগুলোয় শত শত ট্রাক সিমেন্টের মূল কাঁচামাল ক্লিংকার আনা হয়। এসব ক্লিংকার ট্রাক থেকে নিচে ফেলার সময় চারদিক ধুলায় ভরে যায়। ট্রাক থেকে সরাসরি প্লান্টে ফেলা হলে এ ধুলার সৃষ্টি হতো না। প্যাকিং যেখানে হয়, সেখানে ধুলা হয় বেশি। বড় বড় পাথর আকৃতির ক্লিংকার ভাঙিয়ে গুঁড়াকরণ প্রক্রিয়ায়ও ধুলার সৃষ্টি হয়। এসব ধূলিকণা শ্বাসনালি দিয়ে প্রবেশ করলে হাঁপানিসহ ফুসফুসে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এটি শ্রম ঘন শিল্প হওয়ায় শ্রমিকরাই প্রথমে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

নিয়ম অনুযায়ী, দূষণের দায়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের জরিমানা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের তালিকায় উঠে আসে প্রতিষ্ঠানটি। এর পর অধিদপ্তরের দেয়া তালিকা থেকে পরিবেশ সুরক্ষার সারচার্জ আদায়ের লক্ষ্যে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। নিজ নিজ দেশের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনতে পারবে না। এ কারণে রপ্তানীমুখী প্রতিষ্ঠান গুলো নিয়ম মানলেও দেশীয় বাজারে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গুলো তেমন কোন নিয়ম মেনে চলে না বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আল মামুন জানান।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক শায়লা ফারজানা বলেন, নিয়ম নিতি তোয়াক্কা না করে যেসব সিমেন্ট কারখানা পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি সাধন করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

About arthonitee

Check Also

চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সাভারে অটোরিকশা চালকদের অবস্থান ধর্মঘট

সাভার থেকে শামীম আহমেদ ঢাকার সাভারে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে অটোরিকশা চালকেরা অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *