প্রচ্ছদ / মতামত / ধর্ষণ-এক মহামারী

ধর্ষণ-এক মহামারী

ইনামুল আসিফ লতিফী:

ধর্ষণ বা বলাৎকার হচ্ছে এক ধরণের যৌন সহিংসতা বা যৌন আক্রমন। অধিকাংশ রাষ্ট্রে ধর্ষণ বলতে কোনো ব্যক্তি দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার উপর বলপ্রয়োগ করে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হওয়াকে বুঝায়। রাষ্ট্রভেদে ধর্ষণের সংজ্ঞার মাঝে তারতম্য দেখা যায়। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৫ নং ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ বর্তমানে এক মহামারী আকার রূপ ধারণ করছে, ধর্ষণের পরে বা ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে ব্যাপকভাবে। যাদের একটু-আধটু অথবা নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস আছে তাদের জন্য ব্যাপারটা কষ্টদায়ক। বিশেষ করে নারী বা শিশু যারা খবরের কাগজ পড়েন তাঁরা খুবই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ধর্ষণ যে কত মহামারী আকার ধারণ করেছে তা বোঝা যায় দৈনিক প্রথম আলো, বাংলানিউজ২৪.কম বা জাগোনিউজ২৪.কম এর মত বহুল জনপ্রিয় নিউজএজেন্সিগুলো তাদের ওয়েবপেজে “ধর্ষণ” ট্যাগ ব্যবহার করে আলাদা একটা টপিক করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী বছরের শুরুতেই জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৯জন (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো), অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যা প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুইয়ের অধিক ধর্ষণের ঘটনা নির্দেশ করে। কি ভয়াবহ ব্যাপার, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ‘ধর্ষণ’ আর ‘হত্যা’-এর জন্য আমরা পাকিস্তানিদের সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি, সেই ধর্ষণই আমাদের রাষ্ট্রে আমাদের অগোচরেই পাকাপোক্ত জায়গা করে নিচ্ছে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ধর্ষণের ঘটনাগুলো সংগঠিত হচ্ছে গ্রামেগঞ্জে রাতের-আঁধারে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে, পারিবারিক ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে, প্রেমের নামে বা বিবাহের আশ্বাস দিয়ে শারীরিক সম্পর্কে স্থাপনের মাধ্যমে, শিশুদের উপহার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নির্জনে ডেকে নিয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটির পর বা নিজ গৃহে পড়ালেখায় সাহায্যকারী ব্যক্তির দ্বারা, পরিবারের সদস্য নিকটাত্মীয় বা বন্ধু দ্বারা, নেশাগ্রস্তদের দ্বারা, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে, ফাঁকা যানবাহনে ইত্যাদি। বাংলাদেশে শিশু অধিকার কর্মীদের ভাষ্যমতে, দেশটির শতকরা নব্বই ভাগ শিশুই পারিবারিক গণ্ডিতে ধর্ষণ থেকে শুরু করে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শসহ নানা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে (৩১ অগাস্ট ২০১৩, বিবিসি বাংলা)।
আমাদের দেশে ধর্ষণ যে মহামারী আকার ধারণ করেছে তার পেছনে অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন মজবুত না হওয়া, নীতি-নৈতিকতার অভাব, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব বা সামাজিক অবক্ষয়, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল সাইটের অপব্যবহার ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব।
ধর্ষণের মত ন্যাক্কারজনক ব্যাপারটিকে থামানোর জন্য সরকার ও প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দেশের তরুণসমাজের বড় একটি অংশ ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের দাবী জানিয়ে আসছে ও আন্দোলন করে চলেছে এবং এ সংক্রান্ত খবরও এসেছে- “ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা” (১ এপ্রিল ২০১৮, বাংলা ট্রিবিউন);। ইতিমধ্যেই আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্র ভারত ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষণের শাস্তিহিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আইন পাশ করেছে  (২২ এপ্রিল ২০১৮, দৈনিক কালের কণ্ঠ)। সময় এসেছে আমাদের দেশের আইন প্রণেতাগণ ধর্ষণ প্রতিরোধে ক্ষেত্রবিশেষে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাশ করার। ইন্টারনেটে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে অজস্র এডাল্ট ও পর্ণ ওয়েবসাইট, এগুলো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবী। ২০১৬ সালে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম অনেক ঘটা করে দেশে সব পর্ণ সাইট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং চেষ্টাও করেছিলেন, এমনকি মহামান্য হাইকোর্টও ২০১৮ সালে পর্ণসাইট বন্ধের জন্য বিটিআরসিকে নির্দেশ দেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দূর্বলতার কারণে পর্ণসাইটগুলো পুরোপুরি বন্ধের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, এক্ষেত্রে আমরা এশিয়ার অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র চীনকে অনুসরণ করতে পারি, চীন ২০১৮ সালে প্রায় ২২,০০০ পর্ণসাইট বন্ধ করে দিয়েছে (২৫ মে ২০১৮, দৈনিক মানবকন্ঠ)। মাধ্যমিকের সমাজবিজ্ঞান এবং ধর্মীয়শিক্ষার বইয়ে ধর্ষণের মত জঘন্যতম অপরাধের কুফল ও শাস্তি সম্পর্কে অবহিত করা যেতে পারে। আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় পারিবারিক শিক্ষা একজন ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পরিবারের সদস্যদের উচিত হবে ছোটবেলাতেই শিশুদের কারো অযাচিত স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করা। তরুণদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলোর উচিত ধর্ষণের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো, কেননা সাধারণ জনগণের মধ্যে মানবিকতা গড়ে না উঠলে শুধু সরকার ও প্রশাসনের একার পক্ষে  ধর্ষণকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব না।
আর নয় ধর্ষণ, গড়ে তুলুন আন্দোলন। আর নয় ধর্ষণ, গড়ে তুলুন প্রতিরোধ। আর নয় ধর্ষণ, গড়ে তুলুন সচেতনতা। দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ধর্ষণের মত নিকৃষ্টতম অপরাধকে আমাদের প্রতিহত করতেই হবে।

ইনামুল আসিফ লতিফী
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

About arthonitee

Check Also

ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি ও স্থানীয় ছাত্রলীগ

হৃদয় তালুকদার : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া ছাত্র সংগঠন। গৌরব,ঐতিহ্য,সংগ্রাম ও সাফল্যের ৭১ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *