প্রচ্ছদ / মতামত / দ্য পাঠানস: জাতি নয়, পাঠান একটি চেতনা

দ্য পাঠানস: জাতি নয়, পাঠান একটি চেতনা

পেশাওয়ার থেকে খাইবার হয়ে ওয়াজিরিস্তান— একই সঙ্গে নয়নাভিরাম ও নিষ্ঠুর এই প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর গল্প।
নিজেদের কোনো রাষ্ট্র গঠন করতে না পারলেও এরা ছিল অনেক রাজ্যের নিয়তির নিয়ন্তা। সময় ও সমর পাল্টেছে শুধু, পাঠানরা আছে আগের মতোই

কান্দাহার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকলেও পাঠানভূমের সমস্যা মোগলদের পিছু ছাড়েনি। ক্ষমতারোহণের তৃতীয় বছরে প্রপিতামহ বাবুরের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে কাবুল যান জাহাঙ্গীর। কান্দাহারের দায়িত্বে শাহ বেগের এক যুগ পূর্তি হচ্ছিল তখন। সফরকালে জাহাঙ্গীর এক ফরমানের মাধ্যমে শাহ বেগকে ‘কাবুল, তিরাহ, বাঙ্গাশ, সোয়াত ও বাজাউরের সমস্যাসংকুল সরকারের পূর্ণ দায়িত্ব এবং এসব অঞ্চলের আফগানদের বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, তাদের বসতিগুলোর জায়গির ও খান-ই-দৌরান উপাধি দান করেন।’
জাহাঙ্গীরের ফরমানে তিরাহ ও বাঙ্গাশের নামোল্লেখ নজর এড়ানোর নয়। কারণ এ দুটি স্থানে রোশানিয়ারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। দিল্লির শাসকদের সঙ্গে রোশানিয়াদের সরাসরি সাক্ষাতের শুরু সীমান্ত প্রদেশে আকবরের পদার্পণের সময় থেকে। মির্জা হাকিমের কাছ থেকে কাবুল জয় শেষে ফেরার পথে আকবর ‘গুরুতর বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টিকারী’ এক তরুণকে রাজকীয় ফরমানবলে ক্ষমা করেন। এ তরুণ ছিল বায়েজিদের পঞ্চম পুত্র জালালা। আকবর তাকে দুটি কারণে ক্ষমা করেন। প্রথমত. জালালা ছিল ছেলেমানুষ। দ্বিতীয়ত. আকবর রোশানিয়াদের প্রতি সহমর্মিতা বোধ করতেন। কারণ তিনিও এদের মতোই ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কিত মত প্রবর্তনে উদ্যোগী ছিলেন।
১৫৮৬ সালে দ্বিতীয়বার পাঠানভূমে এসে আকবর আবারো জালালার কথা জানতে পারেন। তবে এবার অন্যভাবে। আকবর আটকে অবস্থান করছিলেন। মান সিংহকে তিনি কাবুলে দায়িত্ব নিতে পাঠান। মান সিংহ দেখতে পান, খাইবার পর্যন্ত পথের বিভিন্ন অংশ রোশানিয়াদের দ্বারা ভীষণভাবে আক্রান্ত। আফ্রিদি, খলিল ও মোহমান্দদের নিয়ে বিরাট বাহিনী গঠন করেছে জালালা। পথের বিভিন্ন অংশে এ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া জালালা ‘আফগানদের রাজা’ উপাধি নিয়েছে। বস্তুত সত্যিকার কোনো আফগান রাজার আবির্ভাবের প্রায় ২০০ বছর আগেই জালালা এ উপাধি নিয়েছিল। যা-ই হোক, বাধা-বিপত্তি হটিয়ে মান সিংহ কাবুলে পৌঁছেন। এদিকে রোশানিয়ারা বাগরামে (কান্দাহারের কাছে) এক ধর্মগুরুকে হত্যা করে। বিশৃঙ্খলা ও উপদ্রব মাত্রা ছাড়ার উপক্রম হলে রোশানিয়াদের দমনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মান সিংহ তার বাহিনী নিয়ে তিরাহর উদ্দেশে রওনা হন। আর আটক থেকে সম্রাট আরেকটি সৈন্য দল পাঠান। পরিকল্পনা ছিল, শেষোক্ত দলটি খাইবারে মান সিংহের সঙ্গে যোগ দেবে।
রোশানিয়াদের দমন করা সহজ ছিল না। মান সিংহ নিজেই আলি মসজিদ এলাকায় তাদের হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। আটক থেকে যাওয়া সৈন্যদল তাকে উদ্ধার করে। খলিল ও মোহমান্দরা যেভাবে রোশানিয়াদের হয়ে লড়াই করে, তাতে তাদের অবিশ্বস্ততা প্রমাণিত হয়। মাত্র পাঁচ বছর আগে তারা সম্রাটের কাছে ইউসুফজাইদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়েছিল। তারা বলেছিল, ইউসুফজাইরা বাণিজ্যবহর ও কারাভাঁয় লুটপাট করছে; কিন্তু বদনাম হচ্ছে তাদের। আসলে খলিল ও মোহমান্দ গোত্রপতিরা আকবরের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছিলেন দুটি উদ্দেশ্যে। প্রথমত. রোশানিয়াদের পক্ষে তাদের কর্মকাণ্ড আড়াল করতে। দ্বিতীয়ত. সম্রাটকে ইউসুফজাইদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে।
আসনবিলাসী ঐতিহাসিক ও মজলিসি ভাষ্যকাররা সাধারণত অমাত্যদের সাফল্য ও স্তুতি গাইতে প্রয়াসী হন। রোশানিয়াদের বিরুদ্ধে আকবরকে কী ভীষণ বেগ পেতে হয়েছিল, তা বোঝা যায় তার পারিষদের বিবরণীতে, ‘আসল কথা হলো, সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণ পরাস্ত ও পালাতে বাধ্য করা হয়েছিল।’
আকবরের পর জাহাঙ্গীরের আমলে একই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। অবশেষে শাহজাহানের আমলে কাবুলের গভর্নর সাইদ খানের মধ্যস্থতায় রোশানিয়াদের নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়েছিল।
লান্দাইয়ের সঙ্গে যেখানে ইন্দুজের সংযোগ ঘটেছে, সেখানে নদীর বুকে দুটি কালো পাথরের চাঁই রয়েছে। উজানের ঢলে বহু নৌকা এসব পাথরে আছড়ে পড়ে ভেঙেছে। স্থানীয়রা পাথর দুটির নাম দিয়েছে জালালিয়া ও কামালিয়া। তাদের মতে, বায়েজিদের আকর্ষণেও একইভাবে আত্মারা ছুটে গিয়ে ধ্বংস হয়েছে।
রোশানিয়াদের নিয়ে বিতর্ক যা-ই থাকুক, ক্ষ্যাপাটে, স্বাধীন পাঠান চেতনা তাদের স্মৃতিই বহন করছে।
পাঠান আসলে কোনো জনগোষ্ঠী নয়। একটি চেতনার নাম। কখনো আফগান, কখনো পাহাড়ি— নানা অভিধায় পরিচিত হয়েছে এ চেতনা। এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে আধিপত্য চর্চা করেছে পারসিক, গ্রিক, স্কাইথিয়ান, শক, কুষাণ, হুন, আরব, তুর্কি, মোঙ্গল ও মোগলরা। শাসকের পাশাপাশি শাসিতেরও রূপান্তর ঘটেছে। বিভিন্ন সভ্যতা, সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে সেই সত্তা, যার নাম হয়েছে পাঠান।

(ওলাফ ক্যারোর ‘দ্য পাঠানস’-এর অনুবাদ করেন সাঈদ হাসান। সেখান থেকে চুম্বক অংশ সংগ্রহ করেছেন ইঞ্জি. বায়োজিদ খান পাঠান)

About arthonitee

Check Also

বেঁচে থাকলে কিভাবে কত ইনকাম করব আর মরলে কত ক্ষতিপূরণ পাব?

এহছান খান পাঠান: সোস্যাল মিডিয়ায় একের পর এক পোড়া চকবাজার ট্রাজেডির ধ্বংসস্তূপের ছবি। মনে হয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *