প্রচ্ছদ / মতামত / দায়ী কে

দায়ী কে

হোসনে আরা বেনু:

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড । আর সে মেরুদণ্ডকে ক্যালসিয়াম দিয়ে তার ভিত শক্ত করেন একজন শিক্ষক । শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর তার প্রথম পাঠশালা পরিবার ছেড়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ছোট ছোট পায়ে , দুরু দুরু বুকে মায়ের আঁচল ছেড়ে বিদ্যালয়ে গমন করে । মমতাময়ী শিক্ষকের ভালোবাসা আর স্নেহের সান্নিধ্যে তারা সমস্ত ভয় পিছনে ফেলে শিক্ষা অর্জনের পথে ধাবিত হয়।

আমি দেখেছি বাচ্চাদের কিছু শেখাতে গেলে ওরা বলে , তুমি কিছু জানোনা; এটা আমার মিস বলেছে, এটাই ঠিক( টিচাররা অনেক সময়ই ভুল লেখায় ও রাইট সাইন দিয়ে দেয়…..আবার ওটা পরীক্ষায় লিখলে কেটে দেয়)
যে শিক্ষক এতো স্নেহ, ভালবাসা, শাষন আর জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত পথ আলোকিত করেন তিনি কি করে একজন কন্যা সমতুল্য ছাত্রীকে আত্তহননের দিকে ঠেলে দিলেন????

ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ এর নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর মৃত্যু কষ্ট দুচোখে বাঁধ ভাঙ্গা জলের মতো ভেসে যাচ্ছে। আমার মেয়েরা ও ওই স্কুলে পড়ে। অহনা , অধরা ,অরিত্রি যেন তিন মেয়ে আমার…..অরিত্রি আজ “অ ” এর গল্প হয়ে গেল।

দেশের শীর্ষস্থানীয় স্কুল ভিকারুন্নেসার ছাত্রীরা দেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। এই স্কুলে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য ঢাকায় পরিবার রেখে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে বাবারা ফ্যামিলিবিহীন একা একা কতো কষ্ট করছেন।অনেকে কয়েক বছর ড্রপ দিয়ে ও বাচ্চাদের এই স্কুলে ভর্তি করান।

অন্তত এইচএস সি পর্যন্ত নিশ্চিন্ত থাকা যায়। কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নানা সময়ে সেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ আছে।

অরিত্রি খুব মেধাবী ছিল। তাহলে সে টুকলি করার উদ্দেশ্যে স্কুলের রুলস ভেঙে মোবাইল নিয়ে আসলো কেন? এতো ভালো ছাত্রীর টুকলির প্রয়োজন হলো কেন? তার অভিভাবকের কেন মোবাইলের বিষয়টি নজরে এলো না ? তারা বাচ্চার ব্যাপারে কেন এতো উদাসীন?
অরিত্রির কি প্রিপারেশন ভালো ছিল না ? ওকি পরীক্ষার আগের রাতে টিভিতে কোন পছন্দের অনুষ্ঠান দেখছিল? ট্যাবে গেমস খেলছিল? নাকি পড়াশোনার চাপে একটু প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাচ্ছিল??

আমরা সেই দম ফেলার সময়টা দিচ্ছি কোথায়! বাচ্চাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অসীম। নাচ, গান, লেখাপড়া সব দিকেই সেরা হতে হবে। কোচিং , বাসার টিচার … বইয়ের ভারী ব্যাগ ,বহন করতে যেয়ে শিক্ষার্থী রা শারিরীক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।আমাদের শিক্ষক, নীতি নির্ধারকগণ যতই মুখে বলুক পড়াশোনার চাপ কমানোর জন্য তারা নানান দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটা হচ্ছে ?? সেটা কি ক্ষতিয়ে দেখছেন?

এখন বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। প্রতিদিন ই প্রায় দেখি বাচ্চারা জ্বর, বমি, মাথা ব্যথা নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমার মেয়েটাই তো বলে; যদি হানড্রেড মার্কস আনসার করতে না পারি এই ভীতিটা ওদের গ্রাস করছে। না পারলে তো মাম্মার মাইরররর….

অরিত্রির কাছে মোবাইল পাওয়াতে অবশ্যই শিক্ষক বকবেন, শাষন করবেন । তার ভুলটা ধরিয়ে দেবার দায়িত্ব শিক্ষকের । নাহলে সে নিজেকে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ভেবে এই কাজটা আবার ও করবে। শাসন করার মধ্যে একটা স্নেহ মিশ্রিত ভালোবাসা ও থাকবে। কিন্তু একজন অভিভাবকের সাথে এমন আচরণ আমরা কেউ প্রত্যাশা করিনা যার জন্য তাকে চোখের পানি ফেলতে হবে। বড় অমূল্য এই জল…..এমনি এমনি পড়ে না….এই নোনা জল পেতে আনন্দ,বেদনা, কষ্টের মতো অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়। টিচার বাবার কাছ থেকে আন্ডার টেকেন নিতে পারতো যে এরপর এই ঘটনার পুণরাবৃত্তি হলে কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। কিংবা ঐ পরীক্ষাটা বাতিল করতে পারতো বা নেক্সট ক্লাসে প্রমোশন না দিতে পারতো।

একটা সুযোগ দিতে পারতো। একদম টিসি। লঘু পাপে গুরু দণ্ড।
বাবার সামাজিক মর্যাদা হেয় করার অধিকার তো তার নেই। শিক্ষক বাবাকে ও বোধ হয় তার ছাত্রী ভেবেছে! পা ধরার আগেই টিচারের সংযত হওয়া উচিত ছিল । ( এফ বি তে ওনাদের কথা শুনে লিখছি ,ঐ চার দেয়ালের মধ্যে আসলে কি ঘটেছে আমরা সঠিক ভাবে জানিনা ) একজন বাবা। অনেক ভালবাসার।অনেক আস্থার।

অরিত্রি তার বাবার অপমান সহ্য করতে পারেনি; এই বয়ঃসন্ধিকালে বাচ্চারা ব্ড় বেশী আবেগ প্রবণ হয়; জেদি হয়,, অভিমানী হয়….যার ফলে সে সকল লজ্জা কষ্টের অবসান ঘটিয়ে বাবামাকে নিঃস্ব করে পৃথিবী থেকে চিরজীবনের মতো বিদায় নিল।

টিচারের এমন রুঢ় আচরণ কেন? ধরলাম অনেক বাচ্চা সামলাতে হয়; কিন্তু শাসনের একটা প্রসেস আছে। টেকনিক ফলো করতে হবে। কোমলমতি শিশুদের বয়স বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
শিক্ষকতা একটা মহান পেশা। যার ছত্রছায়ায় আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম আদর্শ মানুষ হয়ে বেড়ে উঠছে। ধৈর্য , সৈর্য, সহিষ্ণুতায় সে হবে ব্যতিক্রম। আমজনতার মতো আচরণ তাকে মানায়না কারণ তিনি শিক্ষক!!!!!
শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্ক বড় মধুর। আমি এখনও শিক্ষকদের সাথে আমাদের মজার মজার গল্প গুলো শেয়ার করি মেয়েদের কাছে। ওরা হেসে লুটোপুটি। আমরা দুষ্টুমি করলে স্যাররা বলতেন; কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক। আমরা স্কার্ফের ফাঁক দিয়ে হাত দিয়ে বেনী ঠিক করতাম; মিটিমিটি হাসতাম।
এখন খবর পাই শিক্ষকের পিটুনিতে কেউ অন্ধ হয়ে গেছে কেউ বা হাতের আঙুল হারিয়েছে….কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
এমন মৃত্যু কারো কাম্য নয়। আমরা লেখার প্লট পেলাম, টিভি তে এ নিয়ে টকশোর ঝড় উঠবে ; নাটক তৈরি হবে। অরিত্রির এই আত্মহত্যার জন্য আসলে দায়ী কারা…..কাদের জন্য , কি কারণে সে এই পৃথিবীর আলো বাতাস উপভোগ করতে পারলো না। শিক্ষকের রুঢ় আচরণ, আমাদের সীমাহীন প্রত্যাশা, নাকি পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ!
যেটাই হোক; সবচেয়ে বড় সত্য হলো অরিত্রি আর তার মাবাবার কোলে ফিরবে না, পড়ার টেবিলে আর কেউ বসবে না।

আল্লহপাক আমাদের সবাইকে আরো একটু ধৈর্য দিন। আমাদের কথায় কেউ যেন আঘাত প্রাপ্ত না হয়। আমাদের শিশুদের কাছ থেকে আমরা যেন ওদের শৈশব কেড়ে না নেই….সুন্দর একটা ভবিষ্যত দিতে পারি।

About arthonitee

Check Also

নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে স্পেশালাইজড স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব চাই

বেল্লাল হোসাইন: ধারাবাহিকভাবে বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা শুধু ব্যাপক পাশের হারই নয় বরং সর্বোচ্চ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *