প্রচ্ছদ / শিল্প-সাহিত্য / হোসনে আরা বেনুর ছোটগল্প “আমার আছো তুমি”

হোসনে আরা বেনুর ছোটগল্প “আমার আছো তুমি”

হোসনে আরা বেনু:

বিয়ে বাড়ি থেকে এসে ঘরে ঢুকতেই ছোট মেয়েটি দৌড়ে এসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে, এতো দেরি করলে কেন ? জানো না গল্প না শুনলে আমার ঘুম আসে না। ছেলেটা এসে মাকে বলে; মাছের কাঁটা বাছতে পারছি না , তুমি কাঁটা বেছে ভাত খাইয়ে দাও।কিছু বলতে গিয়েও বলা হয় না….. ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসে …. ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। নাহ!!! কাউকে গল্প বলে আর ঘুম পাড়ানো হয় না, কেউ ওদের জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা ও করে না। কারণ মিতু আর জাহিদ আঠারো বছরের দাম্পত্য জীবনে নিঃসন্তান।

ছোট দুটো পা,মাথায় একরাশ চুল, মায়া ভরা বড় বড় চোখ আর রক্তিম নরম গালের রাজকন্যাকে নিয়ে যখন ওরা স্বপ্ন রাজ্যে বিচরণ করছিল মাঝপথে হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে যায় বেরসিক ডাক্তারের কথায়। তিনি বলেন আপনারা ভুল ভাবছেন। এটা আসলে একটা টিউমার! ওভারিতে জন্ম নেয়া টিউমারটি অপসারণ করতে গিয়ে আরেকটি জটিল সমস্যা ডাক্তারের নজরে আসে।জরায়ুর গঠনগতজটিল ত্রুটির কারণে মিতু কোনদিন মা হতে পারবে না , এই ত্রুটি জন্মগত।ওদের পৃথিবীটা যেন ওলট পালট হয়ে গেল।

এক সময়ে মেনে নেয় ভাগ্যকে।ওরা অনাথ শিশুদের জন্য একটি আশ্রম দেখাশোনা করে, নানান সোশ্যাল ওয়ার্ক করে , নিজ হাতে বাগান করে ব্যস্ত রাখে নিজেদের। বাগানের নয়নাভিরাম ফুলগুলো যখন পাপড়ি মেলে মনে হয় ওদের রাজকন্যারা যেন খেলছে।মাঝে মাঝে দেশের বাইরে থেকে ঘুরে আসে, শপিং করে…বেশ ভালোই চলছে ওদের। কিন্তু আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব যেন ওদের নিয়ে বড্ড বেশি উদগ্রীব। বুড়ো বয়সে কে দেখবে, কি হবে…এই ধরনের প্রশ্ন করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। যেমন কোনো পার্টিতে হয়ত একটু বেশী আগে পৌঁছেছে, এক ভাবি ফোঁড়ন কেটে বলে; আপনি তো সবার আগেই আসবেন, আপনার তো কোন পিছু টান নেই। দামী কোন শাড়ী পড়লে শুনতে হয়; ভাবী আমাদের বাচ্চাদের ফরমায়েশ পূরণ করতেই সব শেষ হয়ে যায়, আপনার তো ভবিষ্যত চিন্তা নাই; দামী শাড়ি অর্নামেন্টস তো আপনিই পরবেন। জাহিদ একটা বাচ্চাকে আদর করে কোলে নিতে যাচ্ছিল দেখে বেবির বাবা বলে , আরে রাখেন; আপনার অভ্যাস নেই….প্যান্টের ভাঁজ নষ্ট হয়ে যাবে। এখানে কিন্তু শাড়ি বা প্যান্ট মুখ্য নয়।খোঁচা দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া পাছে আবার যদি মিতু ভুলে যায় যে ওরা সন্তানহীন। এরা সবাই ওদের খুব কাছের বন্ধু।মিতু বুঝতে পারে না ওদের মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে কি তৃপ্তি পায় ওরা। আসলে বিকারগ্রস্থ কিছু মানুষ অন্যকে কষ্ট দিয়ে নিজের অজান্তেই এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পেতে চায়।

মা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ।নারীর পূর্ণতা তার মাতৃত্বে। যা সে পায়নি ….ওরা যে বড় অসহায়…. কেউ কেন বোঝে না কত কষ্ট বুকে পাথর চাপা দিয়ে আছে ওরা। সারাদিন অনেক ব্যস্ততায় কাটলে ও মিতুর রাতগুলো কাটে নির্ঘুম।চারদিকটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে ;একটা শূন্যতা যেন গ্রাস করে।কেউ ছবি এঁকে দেয়াল নষ্ট করে না, বুকশেলভের তিন নং তাকের চার নং সারির গীতাঞ্জলি নিয়ে মায়ের মতো করে মেয়ে রবীন্দ্র সংগীত প্র্যাকটিস করে না, খেলনা দিয়ে সারাঘর নোংরা করার জন্য কাউকে মিষ্টি বকুনি দেয়া হয় না। এসব মধুময় সুখানুভূতি থেকে ওরা বঞ্চিত।মিতু জাহিদ কে কেউ বেবি শাওয়ারে যেতে খুব বেশি অনুরোধ করে না।”সো-কলড” বন্ধুদের অযাচিত কুরুচিকর প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর জন্য অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া থেকে নিজেদের ওরা বিরত রাখে।
এসব ওদের গা সওয়া হয়ে গেছে। আজ বিয়ে বাড়িতে জাহিদের ছোটবেলার এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু আনিস ভাইয়ের সাথে অনেক বছর পর দেখা । মিতু কে দেখে দুষ্টুমি করে বললো; ভাবী আপনি এখন ও আঠারো বছর বয়সেই রয়ে গেছেন।জাহিদ আপনার কদর বুঝলো না;কোন সুখই দিতে পারলো না…একটা নপুংসক। বন্ধু হয়ে কিভাবে এমন বাজে মন্তব্য করতে পারলো!!মিতুর ভীষন কান্না পায়।
জাহিদের কোনো সমস্যা নেই ; প্রবলেম তো মিতুর। একটা বাচ্চার জন্য যখন ওরা ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করছিল মিতুর শাশুড়ি তখন ছেলের জন্য মেয়ে ও দেখে ফেলেছিল আর মিতু কে নাতি দিতে অপারগতার কারণে নানা গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছিল। মিতুর প্রতি ভালোবাসা আর কোনো কটুক্তি যেন ওকে দগ্ধ করতে না পারে সেজন্য মা না হবার ব্যর্থতার দায় নিজের মাথায় তুলে নিয়েছিল জাহিদ। শাশুড়ি তখন পিতা হতে ছেলের অক্ষমতার কারণে বৌমা মিতুর জন্য কিন্তু বর খুজতে চায়নি। ওর শাশুড়ির দাম্ভিকতার কারনে বাচ্চা ও দত্তক নিতে পারেনি… তার চিন্তার মূলে ছিল মুলত কোন বংশের সন্তান, কার পাপ !!এসব।

আনিস ভাইয়ের কথায় আজ মিতুর অনেক কষ্ট হয়।চোখ দুটো জলে টইটম্বুর করে; গলাটা ধরে আসে। কষ্ট আর অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে বরাবরের মতো জাহিদ কে বলে; তুমি একটা বিয়ে করে পিতৃসুখ নিতে পারতে।কেন নিজেকে বঞ্চিত করেছো?? আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি।কেন আমার উপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিলে?
জাহিদ মিতুকে পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়ে বলে ; প্রবলেম টা যদি আমার হতো? আমাকে ছেড়ে যেতে পারতে? তবে আমি কেন বিয়ে করবো? আল্লাহ চাইলে তোমার মাঝেই আমার সন্তান পেতাম। উনি যা করেন অবশ্যই তা আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন। হয়তো আমরা আমাদের কোনো কর্মফলে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়েছি। বাচ্চা হলে হয়তো বিকলাঙ্গ হতো যা আমাদের সারাজীবন ধরে কষ্ট দিত। আর এখনকার ছেলেমেয়েরা নিজেদের ফিউচার গড়তে গিয়ে বাবা-মাকে ভুলে যায়। এই তো আমি তুমি মিলে বেশ আছি। আর ঋণের কথা বলছো? তোমার কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। জানতো, আমার মায়ের সন্তান বেশিদিন বাঁচতো না। তার নয় বাচ্চার মধ্যে বেঁচে আছি অন্ধের যষ্টি এই আমি। বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া ছেলে আমি সারাদিন কাটাতাম আড্ডা আর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। তোমাকে দেখে আমার ঘরে ফেরার সাধ জেগেছিল। আমাকে ভালোবাসার আশ্রয় দিয়েছিলে। সংসারের দায়িত্ব নিতে শিখেছিলাম। আমি এখনও প্রথম প্রেমের মতো তোমার মায়াকাড়া ঐ দুটো চোখে হারিয়ে যাই।প্রতিদিন আমি নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি। তুমি আমাকে একটা রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ দিয়েছো….ডানামেলে নাইবা উড়ুক পাখি, নাইবা উঠুক পূর্ণিমার চাঁদ! অমাবস্যার অন্ধকার রাতে ও আমি তোমায় নিয়ে ভেসে বেড়াতে পারবো ঐ আকাশে। আর কিছু প্রয়োজন নেই, আমার তো তুমি আছো।
আবেগে আপ্লুত হয়ে ছাপিয়ে চোখের জলে জাহিদের বুক ভাসিয়ে দেয় মিতু। ওর মহত্ত্ব, ত্যাগ আর ভালোবাসার কাছে মাতৃত্বের সুখ খোজাকে তুচ্ছ মনে হয়, খুব স্বার্থপর মনে হয়। ম্লান হয়ে যায় সন্তানের জন্য বুভুক্ষ মন। ঔরসজাত সন্তানের মা ডাক শোনার জন্য তীব্র বাসনা পিছনে ফেলে মিতু উপলব্দি করে কতো অসহায় পিতৃমাতৃহীন সএহের শিশুরা ওদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, একটু ভালোবাসার জন্য। ওদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। এই অনাথ শিশুদের ভবিষ্যত গড়ে দেয়াতো জাহিদ-মিতুদের দায়িত্ব।।

About arthonitee

Check Also

শাহ মোহাম্মাদ সানাউল হক এর কবিতা “উল্টা পদচিহ্ন ”

  উল্টা পদচিহ্ন শাহ মোহাম্মাদ সানাউল হক   একদিন গল্প হয়ে যায় চেনা কোন অপরাহ্ন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *