প্রচ্ছদ / স্বাস্থ্য / “দাঁতের ডাক্তার ও রোগী সম্পর্কে কিছু কথা”

“দাঁতের ডাক্তার ও রোগী সম্পর্কে কিছু কথা”

 ডাঃ রেসালাতুস সালাম:
বাংলাদেশে দাঁতের চিকিৎসার প্রতি মানুষের সচেতনতা যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী (শিক্ষিত ও সচেতন) ছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠী মুখ ও দাঁতের চিকিৎসার ব্যাপারে এখনও সচেতন নয়। দেশে ও বিদেশে দন্ত চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িত থাকার সুবাদে ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি বাংলাদেশে দন্ত চিকিৎসার ব্যাপারে, এদেশের মানুষের সচেতনতা এখনও আশানুরূপ নয়। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী একাংশ এখনও জানেনই না দন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞান নামে একটি আলাদা বিশেষায়িত বিষয় আছে এবং দেশে বিভিন্ন কলেজে রীতিমত কঠিন অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তা পড়ানো হয় আর সেসব কলেজ থেকে ততোধিক কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে যারা পাশ করেন তাঁদের বলা হয় দন্ত চিকিৎক বা সরল বাংলায় দাঁতের ডাক্তার। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো যে, কোন রোগী যদি মুখ ও দাঁত সংক্রান্ত কোন সমস্যায় পড়েন, তিনি প্রথমেই একজন দন্ত চিকিৎসকের পরিবর্তে একজন জেনারেল ফিজিসিয়ান খুঁজেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা অবশ্য হাটে-বাজারে তথাকথিত ‘ডাক্তারের’ কাছে যান না তা নয়; এসব ‘ডাক্তাররা’ আসলে হাতুড়ে, নামসর্বস্ব ডাক্তার যাদের নেই কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ট্রেইনিং। কোন BDS ডিগ্রিধারী দন্ত চিকিৎসকের সাথে helping hand বা assistant হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর নিজেরাই তাঁদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ শব্দটি বসিয়ে ব্যবসা শুরু করে দেন, যা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের বোঝানোর পরও তাঁরা এসব হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা সেবা নিতে যান যা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে রোগকে আরও জটিল ও নিরাময় অযোগ্য করে তোলে। পরবর্তীতে যখন রোগী আসল ডাক্তারের কাছে যান, অনেক সময় তখন আর কিছু করার থাকে না এবং শেষ পর্যন্ত বেচারা ডাক্তার হয়ে পড়েন বদনামের ভাগীদার। এর অর্থ হলো দেশের জন-সাধারণের একটি বিরাট অংশ মারাত্মক স্বাস্থ্য হুমকি সম্মুখীন। এতক্ষণের এই দীর্ঘ ব্যাখ্যার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের বর্তমান দন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থা সম্পর্কে ও এই চিকিৎসা পদ্ধতির ধরণ সম্পর্কে পাঠককে ধারণা দেয়া এবং সেই সাথে দন্ত চিকিৎসক নির্বাচন ও করণীয় বিষয়ের উপর আলোকপাত করা। মুখ ও দাঁতের সমস্যা হলে প্রথমেই জেনে নিন আপনার নির্বাচিত ডাক্তারের সরকার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক ডিগ্রী বি.ডি.এস. (Bachelor of Dental Surgery) নেয়া আছে কিনা আর সেই ডাক্তারের, বাংলাদেশের সমস্ত ডাক্তারদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বি.এম.ডি.সি. (Bangladesh Medical and Dental Council)-থেকে নিবন্ধন করানো আছে কিনা এবং সেই নিবন্ধনের মেয়াদ আছে কিনা। প্রয়োজনবোধে সেই নিবন্ধন নাম্বারটি জেনে নিয়ে আপনি নিজেই অনলাইনের মাধ্যমে যাচাই করতে পারেন। ডাক্তার নির্বাচন করার পর তাঁর কাছে আপনার সমস্যা বলুন। এক্ষেত্রে কোন কিছু লুকাবেন না বা এড়িয়ে যাবেন না। গর্ভবতী হবু মা অবশ্যই এই তথ্য ডাক্তারকে অবহিত করবেন। চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে ডাক্তারের X-ray নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এই X-ray গর্ভস্থ বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যা কোনভাবেই কাম্য নয়। Tetracycline জাতীয় ঔষধ গর্ভস্থ বাচ্চার হাড় ও দাঁতের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। পূর্বে দীর্ঘমেয়াদী কোন চিকিৎসা (যেমন: জন্ডিস, যক্ষা, সিফিলিজ ইত্যাদি) নিয়ে থাকলে তা অবশ্যই ডাক্তারকে জানাবেন। যদি কেউ pace-maker ব্যবহার করেন, তাহলে তা ডাক্তারকে আগেই অবহিত করুন। দাঁতের চিকিৎসা একটি সময় সাপেক্ষ চিকিৎসা। ডাক্তারকে সময় দিন। এটি আপনার ভালর জন্যই প্রয়োজন। আপনার মুখ ও দাঁতের সমস্যা ও তার সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার অধিকার আছে। কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না রেখে প্রশ্ন করুন, ডাক্তার অবশ্যই তার সদুত্তর দিবেন। দাঁতের চিকিৎসা কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ। সম্ভাব্য চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কে পূর্বেই ভালভাবে জেনে নিন। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের এমনকি অনেক শিক্ষিত মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। প্রথমেই তাঁদের বলি দয়া করে বিভিন্ন উন্নত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিন। সেসব দেশে চিকিৎসা বীমা করা বাধ্যতামূলক। খোঁজ নিয়ে দেখুন সীমিত ক্ষেত্র ছাড়া (life threatening cases) বীমা কম্পানিগুলো দাঁতের চিকিৎসা বীমা করাতে চায় না। কিছু দেশে যেমন UK-তে দাঁতের চিকিৎসা ব্যয় এত বেশী যে সেখানকার রোগীরা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। সেই তুলনায় আমরা বাংলাদেশী দন্ত চিকিৎসকরা যে খরচে চিকিৎসা সেবা দেই তা যথেষ্ট যৌক্তিক ও ন্যায্য।
আর একটা কথা না বললেই নয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী ভুল তথ্য দেন এবং প্রায়শঃ দেখা যায় প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যথা কমে যাওয়ার পর তাঁরা মনে করেন রোগ ভাল হয়ে গেছে।এই বিষয়ে আলোচনার পূর্বে ভুল তথ্য দেয়ার বিষয়টি পরিস্কার করি। দাঁতের enamel-র একটি সমস্যা হলো amelogenesis imperfecta. দাঁতের এই সমস্যায় enamel ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায় এবং দাঁতকে sensitive করে তুলে। এটি একটি genetic disorder যা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও থাকতে পারে। এ বিষয়ে ডাক্তার প্রশ্ন করলে তাঁকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন। দাঁতের ব্যথা (pain) ও দাঁতের শিরশির করা (sensitivity) দুইটা ভিন্ন বিষয়। এই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ভালভাবে বুঝে তারপর তা ডাক্তারকে জানান। দাঁতের ব্যথা না থাকার অর্থ আপনি সম্পূর্ণ ভাল হয়ে গেছেন এমন নয়। Acute pulpitis-র ক্ষেত্রে pulp chamber open করে পুঁজ (inflammatory fluid) বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে, ডাক্তার আপনার প্রচন্ড যন্ত্রণা উপশম করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর কাজ শেষ হয় নাই। তাঁকে আপনার চিকিৎসা সম্পূর্ণ করতে দিন। প্রায়শঃ যা হয়, রোগী ব্যথা না থাকার কারণে মনে করেন রোগ ভাল হয়ে গেছে এবং চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখেন। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় রোগ পরবর্তীতে জটিল আকার ধারণ করেছে যা ডাক্তার কিংবা রোগী কারোরই কাম্য নয়। এই ধরণের বদ অভ্যাস দূর করুন। অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে সতর্ক থাকুন। ডাক্তার আপনাকে যে অ্যান্টিবায়োটিক দিবেন, সেটির কোর্স সম্পূর্ণ করুন। নিজের থেকে কোন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না বা সেবন করা বন্ধ করবেন না। এমনকি রোগ ভাল গেছে মনে হলেও ডাক্তারের দেয়া কোর্স সম্পূর্ণ করুন। যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের মতো মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত পরবর্তীতে কোন লিখায় আলোচনার আশা রাখি। ডাক্তার কমিশন খাওয়ার জন্য X-ray বা পরীক্ষা করতে দেন না। দাঁতের বিভিন্ন চিকিৎসায় X-ray একটি অপরিহার্য অত্যাবশ্যক বিষয়। কোনো দাঁতে ঠিক কি কারণে সমস্যা হচ্ছে তা জানার জন্য X-ray করে দেখা জরুরী। বিশেষতঃ RCT (Root Canal Therapy) জাতীয় চিকিৎসায় X-ray একটি অতি জরুরী বিষয়। দাঁতের root canal-র অবস্থা দেখা থেকে শুরু করে seal করা পর্যন্ত X-ray নেয়া একটি অত্যাবশ্যক বিষয়। এছাড়া কিছু রক্ত পরীক্ষা যেমন – HBSAg test (পূর্বে জন্ডিসের চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীদের ক্ষেত্রে), RBS (ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে); দাঁতের মূল চিকিৎসা শুরুর পূর্বে করা বাঞ্ছণীয়।সুতরাং X-ray কেন বার বার করতে হচ্ছে, রক্ত পরীক্ষা কেন করতে হচ্ছে — কোনো বিরূপ মন্তব্য করার আগে তা জানুন।
—ডাঃ রেসালাতুস সালাম, কনসালট্যান্ট ডেন্টাল সার্জন, বিডিএস (ঢাকা), বিএমডিসি রেজি: নং – ১৯০২

About arthonitee

Check Also

টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্স পাচ্ছে চার প্রতিষ্ঠান

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মেন্টাল অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডিকশন হসপিটাল ও শেফা হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *