প্রচ্ছদ / মতামত / বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় হওয়া দরকার

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় হওয়া দরকার

 ডা. মো. ছায়েদুল হক:

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। যুগে যুগে চিকিৎসার বিষয়টি একটি সেবাধর্মী কাজ হিসেবে পরিগণিত হলেও বর্তমানে এটি একটি সেবাধর্মী বাণিজ্য হিসেবে রূপ লাভ করেছে। নতুন নতুন রোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন ওষুধ, নতুন নতুন প্রযুক্তি ও চিকিৎসাসামগ্রী। চিকিৎসা এখন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ফলে গড়ে উঠেছে বিশালকায় প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল। একজন চিকিৎসক চাইলেই একাকী খুব বেশি স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসা দিতে সক্ষম হবেন না। রোগ নিরূপণ করতে, সঠিক ব্যবস্থাপত্র দিতে বা অপারেশনের জন্য প্রয়োজন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষ পরিবেশ বা হাসপাতাল। তাই বর্তমানে উন্নত মানের চিকিৎসা বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা কেবল এক বা একাধিক ভালো চিকিৎসক হলেই হবে না, তার জন্য দরকার উন্নত মানের যন্ত্রপাতিসহ একটি ভালো হাসপাতাল। প্রয়োজন বিনিয়োগ। বিনিয়োগও বসে নেই। পৃথিবীব্যাপী স্বাস্থ্য খাতে বিশালাকৃতির বিনিয়োগ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির জন্ম দিচ্ছে; জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী। বিনিয়োগের কাজটি কোথাও সরকারি ব্যবস্থাপনায় আবার কোথাও বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানায় সাধিত হচ্ছে। ব্যক্তিমালিকানায় বা বেসরকারি বিনিয়োগের মূলে থাকে লভ্যাংশের প্রচ্ছন্ন হাতছানি। বেসরকারি বিনিয়োগে স্বাস্থ্যসেবার খাতটি ক্রমে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। লভ্যাংশের বিষয়টি বিনিয়োগকারীর জন্য স্বস্তিদায়ক এবং নতুন নতুন বিনিয়োগের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক হলেও সেবাগ্রহীতার জন্য সব সময় তা নয়। বিশেষ করে সেবা গ্রহণের বিপরীতে যখন উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে সেবা গ্রহীতাকে হিমশিম খেতে হয়।
একজন রোগী যখন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন, সেটি হতে পারে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি হাসপাতাল অথবা কোনো কনসাল্টেশন সেন্টার। যেখান থেকেই সেবাগ্রহণ করুন তার জন্য একটা মূল্য নির্ধারিত হবে। যেমন চিকিৎসক বা কনসাল্টেশন ফি; পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ডায়াগনস্টিক বাবদ মূল্য, ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী বাবদ মূল্য, হাসপাতালে ভর্তি থাকলে বিছানা ভাড়া ও অন্যান্য ইউটিলিটি বাবদ মূল্য ইত্যাদি। মূল্য পরিশোধের ব্যাপারে ভিন্নতা আছে। কোনো কোনো দেশ আছে, যেখানে সব খরচ রাষ্ট্র বহন করে। জনগণের পকেট থেকে কোনোরকম অর্থ প্রদান করতে হয় না এবং এটি শতভাগ জনগণের জন্য নিশ্চিত করা হয়। সৌদি আরব বা ওমানের মতো দেশ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরাসরি এ ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। আবার ডেনমার্ক ও সুইডেনের মতো দেশ তার জনগণের কাছ থেকে স্বাস্থ্য খাতের জন্য আরোপিত কর আদায়ের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ থেকে এ ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। আবার কিছু দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া বা সিঙ্গাপুর স্বাস্থ্যবীমার মাধ্যমে এ ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। স্বাস্থ্যবীমা এমন একটি বিষয় যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের একটি যৌথ তহবিল গঠন করা হয় যা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্ব¡াবধানে পরিচালিত হয়। ওই তহবিলে ওই ব্যক্তি প্রতি মাসে কিছু অর্থ জমা করবেন এবং কিছু অর্থ সরকারের তরফ থেকে বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া হয়। এভাবে যৌথ জমার মাধ্যমে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে গড়ে ওঠে স্বাস্থ্যবীমা তহবিল। প্রয়োজনের সময় ওই ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য ওই তহবিল থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারবেন এবং বাকি স্বল্প পরিমাণ নিজের পকেট থেকে প্রদান করবেন। ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের বেলায়ও এ সুবিধাটুকু থাকে। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা ও হাসপাতালের খরচ নির্বাহে সরকার একটি বিশাল অঙ্কের দায় বা মূল্য পরিশোধ করে থাকে। সরকার এর জন্য স্বাস্থ্য খাত বাবদ কর আদায় করে থাকে। এতে সুবিধা হলো কর প্রদানের সময় সামর্থ্যবানদের করযোগ্য করা হয়। কিন্তু ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এর ফল ভোগ করতে পারে। আবার তাৎক্ষণিকভাবে একসঙ্গে পকেট থেকে খুব বড় অঙ্কের অর্থ প্রদান করতে হয় না বিধায় সবাই সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা নিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একদম ভিন্ন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে একজন রোগীকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নিজের পকেট থেকে প্রদান করতে হয় ৬৭ শতাংশ। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ খরচ হয় ওষুধ ক্রয় ও কনসাল্টেশন ফি বাবদ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি বাবদ খরচ করতে হয় ১০.৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানে যারা নিজ উদ্যোগে দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে যান, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সেই খরচ আমলে নিলে নিজস্ব পকেট থেকে খরচের হার আরও বেশি হবে। চিকিৎসা ব্যয় এখন একটি অত্যাবশ্যকীয় খরচ। যেমন সন্তানের পড়াশোনা ও লালন-পালনের খরচ, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ইউটিলিটি খরচ। এসব খরচ বাদ দিয়ে হাতে যা থাকে, তা দিয়ে যদি সাংসারিক প্রয়োজন, খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি ব্যয় নির্বাহে সংকুলান হয়ে যায়, তবে কোনো সমস্যা নেই। বিপত্তি ঘটে যখন চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সংসারের অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। চিকিৎসা ব্যয় আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় নিজস্ব পকেট থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা মূল্য পরিশোধের বিষয়টি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে একটি অন্তরায়। আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার বা পকেট থেকে নগদে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ একটি প্রকট সমস্যা। অনেক পরিবার আছে, তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ সংস্থান করতে না পারায় সময়মতো সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার অনেকেই ধারদেনায় পতিত হচ্ছেন। চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারে শাখের করাতের মতো। চিকিৎসার ব্যাপারটি না উপেক্ষা করতে পারছেন, না ব্যয় নির্বাহ করতে পারছেন। এটিকে অনুধাবন করতে না পারলে আমাদের বিশেষ করে মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে।
চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের বিষয়টি সহজতর করার জন্য কয়েকটি বিষয় আমলে নেওয়া যেতে পারে। যেমনÑ বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে ভৌত অবকাঠামো গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়টি সর্বজনীন করতে পারলে জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসবে এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর চাপ কমে আসবে। অবশ্যই মানের দিকটি খেয়াল রাখতে হবে। সরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা বর্ধিতকরণ ও মানোন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমনÑ অক্সিজেন সরবরাহ, চিকিৎসাসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি এমনকি ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে সরকার প্রণোদনা দিতে পারে। যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। স্টাফ ও অন্যান্য প্রশাসনিক খরচের বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। একটাই শর্তÑ চিকিৎসা ব্যয় সাধারণের নাগালে নিয়ে আসা। স্বাস্থ্যবীমা চালু করার বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। জনগণকে সবচেয়ে বেশি ব্যয় নির্বাহ করতে হয় ওষুধ ক্রয়ে। বর্তমানে ক্যানসারসহ অনেক জটিল রোগের নতুন নতুন ওষুধ বাজারে আসছে, যার দাম অনেক বেশি। এসব ওষুধে কর রেয়াত সুবিধা বা প্রণোদনার মাধ্যমে ক্যানসার রোগের চিকিৎসা সাশ্রয়ী করা যায়। যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর রেয়াত ও ডায়ালাইসিস ফ্লুইড স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করার মাধ্যমে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ সাধারণের নাগালে নিয়ে আসা যায়। অনুরূপভাবে অক্সিজেনে ভর্তুকি বা বিনামূল্যে সরবরাহ করা গেলে মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা অনেকটাই সাশ্রয়ী হতে পারে। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যেসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন, সেগুলোয় কর রেয়াত দিলে এবং দামি চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর রেয়াত এবং ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে খরচ অনেক কমে যাবে। এ পদক্ষেপগুলোয় খুব যে বিরাট অঙ্কের তহবিলের প্রয়োজন হবে, তাও নয়। তবে অবশ্যই সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সততার সঙ্গে কাজটি করতে হবে। সবশেষে বলতে হয়, সরকারকে অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ কিছুটা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য করের কথাও ভাবা যেতে পারে।

ডা. মো. ছায়েদুল হক : চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

About arthonitee

Check Also

সত্যিই কি আবহাওয়ার সঙ্গে ব্যথার সম্পর্ক আছে?

যাদের বাতের বা শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথার সমস্যা রয়েছে, তারাই কেবল এর কষ্ট বোঝেন। এসব …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *