প্রচ্ছদ / মতামত / চিকিৎসায় আস্থার সংকট ও ভুল চিকিৎসা

চিকিৎসায় আস্থার সংকট ও ভুল চিকিৎসা

  ডা. ছায়েদুল হক

 জীবন বাঁচাতে মানুষ সৃষ্টিলগ্ন থেকে একের পর এক নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে; একই সঙ্গে নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। প্রাথমিক দিকে চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যক্তি বা চিকিৎসকনির্ভর হলেও এখন এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এত দ্রুত উন্নতি সাধন করছে যে, একটি হাসপাতাল কয়েক দশক আগেও যেখানে সামগ্রিকভাবে প্রায় সব ধরনের চিকিৎসার আশ্রয়কেন্দ্র ছিল, এখন সেটি অনেকটাই অপ্রতুল। প্রয়োজন হচ্ছে নতুন নতুন সব বিশেষায়িত হাসপাতালের। সেখানে সন্নিবেশিত হচ্ছে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল মানে বিশাল বিনিয়োগ। কে না জানে বর্তমান মুক্ত অর্থনীতির যুগে বিনিয়োগ মানেই মুনাফা। চিকিৎসাসেবা প্রদানে চিকিৎসক এবং রোগীর পাশে এখন তৃতীয় পক্ষ হলো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের ছায়ায় বিনিয়োগকারী। বিনিয়োগ ও মুনাফার দায় স্বাভাবিকভাবেই রোগীর কাঁধে বর্তাচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে চিকিৎসা খরচ। এভাবেই অতীতে একজন রোগী মানে ছিলেন একটি মানবিক বিষয়, এখন তিনি কেবল রোগী নন একজন ভোক্তাও বটে। তাকে চিকিৎসাসেবা ক্রয় করতে হচ্ছে। চিকিৎসাসেবা এখন মানবিকতার গ-ি পেরিয়ে বাণিজ্যিক উপাদানে দ্রুত ধাবমান। এই দ্রুততার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না সমাজ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের একটি অংশ চিকিৎসা খরচ নির্বাহ করতে গিয়ে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে এবং এর একটি অংশ প্রতি বছর দরিদ্রসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এখানেই সৃষ্টি হচ্ছে গভীর সংকটের। এ সংকট আস্থাহীনতার সংকট; এ সংকট চিকিৎসার সংকট।
চিকিৎসাসেবার এই সংকট দেশে দেশে বিদ্যমান। আমেরিকায় ওবামা কেয়ার নিয়ে যে হৈচৈ হচ্ছে, তাও এই চিকিৎসাসেবা প্রদানসংক্রান্ত সমস্যাকে ঘিরেই। পৃথিবীতে দুটি দেশ সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ড সর্বজনীন চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পেরেছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, থাইল্যান্ডসহ হাতেগোনা কয়টি দেশ সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা প্রদান প্রায় নিশ্চিত করতে পেরেছে। বিষয়টি একটু জটিল এই জন্য যে, এটি কেবল বাজেট থাকলেই সম্ভব তা নয়। একেক সমাজে এই সমস্যার স্বরূপটি একেক রকম। আমাদের বাংলাদেশের কথা যদি বলি, তারও স্বরূপ হরেক রকম হবে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ১২ শতাংশ রোগী চিকিৎসা খরচ নির্বাহ করতে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হন। অদূর ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যয় নিম্নমুখী হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ চিকিৎসা খরচ বিরাট এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই জনপদটিকে। চিকিৎসাসেবায় আস্থা সংকটের দ্বিতীয় কারণটি মনস্তাত্ত্বিক। বিশেষায়িত কিছু চিকিৎসা বাদ দিলে সামগ্রিক চিকিৎসাসেবা এখনো সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন হচ্ছে। অর্থাৎ লোকজন স্বল্প খরচে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা নিতেই অভ্যস্ত। এমতাবস্থায় হঠাৎ কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অথবা অন্য কোনো কারণে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার কোনো হাসপাতালের স্মরণাপন্ন হলে ভিন্ন এক পরিস্থিতির শিকার হন। গত কয়েক দশকে চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে যে অতিরিক্ত খরচের ভার রোগীর কাঁদে ঝেঁকে বসেছে তা তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। হঠাৎ বিশাল অঙ্কের খরচের মুখোমুখি হয়ে নিম্ন আয়ের লোকজন তো বটেই, মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চ মধ্যবিত্ত অনেকেই বেশ অসহায় বোধ করে থাকেন। এসব রোগীর বেলায় করপোরেট হাসপাতালগুলোর মনোভাব একটু ভিন্ন মেজাজের হয়ে থাকে। বিশেষ করে সেসব রোগী যারা শেষ পর্যন্ত খরচ সংকুলান করতে ব্যর্থ হবেন বলে মনে করা হয়, তাদের প্রতি প্রতিষ্ঠানগুলো একরকম সতর্ক দৃষ্টি রাখে, যাতে তাদের পাওনাটা সঠিক সময়ে আদায় করে নিতে পারে। এর জন্য মাঝপথে রোগীর চিকিৎসা বন্ধ করে তাদের অন্যত্র নিয়ে যেতে চাপ সৃষ্টি করতেও পিছপা হয় না। রোগীরও আগে থেকে তেমন একটা ধারণা থাকে না রোগী কতটা জটিল বা তার চিকিৎসায় কী পরিমাণ খরচ হবে। অনেক সময় যখন বুঝতে পারেন খরচ নির্বাহ করা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে তখন অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা করে বা সম্পদ বিক্রি করে রোগীর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করে থাকেন। আবার অনেকেই খরচ নির্বাহ করতে না পারার কারণে হয় কোনো সাশ্রয়ী হাসপাতালে রোগীকে শিফট করে থাকেন, যদিও সেখানে যথাযথ চিকিৎসার সম্ভাবনা কম থাকে অথবা চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এসব রোগীর লোকজন যারা চিকিৎসা নিতে গিয়ে আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে পড়েন তাদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার জন্ম নেয়, যা তাদের সমাজের অবহেলিত অংশ হিসেবে নিজেদের ভাবতে বাধ্য করে।

About arthonitee

Check Also

খনিজ তেল (base oil) এর প্রকারভেদ

ইঞ্জি. জয়নাল আবেদিন: ২০১৭ সালে, সারা পৃথিবী ব্যাপী লুব্রিকেন্টস এর চাহিদা ছিল ৩৭.৫ মিলিয়ন মেট্রিকটন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *