শিরোনাম
প্রচ্ছদ / মতামত / আমাদের অগ্রগতি কোথায়????

আমাদের অগ্রগতি কোথায়????

hri

হৃদয় তালুকদার:

শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানোর চেষ্টায় বাংলাদেশ।আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রয়াস নিয়েই শিক্ষার প্রসারে ব্রতী সরকার। কিন্তু সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছি আমরা কোথায়?
বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে সমাজের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা কুসংস্কার আর কুশিক্ষা।সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নারী শিক্ষার অগ্রগতির পথ।প্রতিবছর ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য নারী।শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করার আগেই জীবন পথের মোড় উল্টা দিকে ঘুরে যাচ্ছে মেয়েদের।বিশেষ করে প্রত্যন্ত এবং পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে।সরকারের উদ্যোগে স্কুল -কলেজের অভাবটা কমে আসলেও নারী শিক্ষার ব্যাপারে দেশ এখনো পিছিয়ে।যদিও অনেক মেয়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারছে।অনেক দুর এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে তবুও সমাজ অতদূর আগাতে পারেনি।পিছিয়ে রয়েছে মানসিকতায়,পিছিয়ে রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গিতে।
কৈশোরের গণ্ডি না পেরুতেই সংসার নামক এক কঠিন বাস্তবতায় এসে পড়তে হচ্ছে অনেক মেয়েদেরকে।সপ্তম -অষ্টম শ্রেণীতে না উঠতেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হচ্ছে মেয়েদের।
স্কুলের বেলা হলে দেখা যায় গ্রামীণ মেঠোপথের মাঝ দিয়ে দলবেধে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে।তখন মনে হয় কতটা সচেতন হয়েছে সমাজ।কতটা অগ্রগতির পথে বাংলাদেশ!কিন্তু শেষরক্ষা কতজনের হয়?ওর মাঝখান থেকে অনেকেই ঝরে পড়ে।কেউ ঝরে পড়ছে সমাজের চোখের ভয়ে!কেউ ঝরে পড়ছে বাবা মার কাছে বোঝা হয়ে আবার কেউ কেউ ঝরে পড়ছে পাত্র পক্ষের অতি আগ্রহের শিকার হয়ে।
বাল্যবিবাহ,শিশুবিবাহ প্রথাসমাজে এখনো বেচে আছে।
প্রচার -প্রচারণার শেষ নেই তবুও কেন দমাতে পারছিনা আমরা এহেন প্রতিবন্ধকতাকে?অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য এটাই যে বাল্যবিবাহ এবং যৌতুক প্রথা নিবারণের যে প্রচারণাগুলো সেগুলো কেমন যেন পণ্যের বিজ্ঞাপনের মতো হয়ে গেছে।সেটা করা হচ্ছে রাস্তাঘাটে,হাটে -বাজারে,হলরুমে,টিভি,রেডিওতে।কিন্তু জায়গামতো প্রচার গুলো হচ্ছেনা।প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে এসব পৌছাচ্ছে কোথায়?বড়জোর ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে আর কোন অফিসের বড় কোন কক্ষে।কিন্তু এতেই কি সমাধান আসবে?বা এসেছে?আসেনি।সাধারণ মানুষদের বাল্যবিবাহের কুফল,যৌতুকের ভ্রান্ত ধারণা সম্পর্কে বিশদভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে।বাল্যবিবাহের কারণে একটা মেয়ের কি কি সমস্যা হতে পারে এবং পরিবারের প্রতি সেটা কি ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে।যৌতুক প্রথার সর্বনাশা দিক,ফলাফল এবং এতে করে কিভাবে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছি আমরা সেই বিষয়ে স্পষ্টাস্পষ্টি আলোচনা না করে শুধুমাত্র একটি গ্রামের জন কয়েক শিক্ষিত মহিলা-পুরুষদের ডেকে নিয়ে এসে ইউপি হলরুমে নমো নমো করে আলোচনা শেষ করে খাবারে প্যাকেট বিলি করলে এর সমাধান আসবেনা।
সবচেয়ে বাজে ভাবে সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলো।প্রচারণার নামে মাঝে মাঝে দেখি এরা ইউনিয়ন পরিষদের হলরুম গুলোতে মেম্বার-চেয়ারম্যান এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডেকে নিয়ে ঘন্টাখানিক সময়ের মধ্যে আলোচনা সেরে শেষে খাবারের প্যাকেট সবার হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নিচ্ছেন।এতে লাভটা কি হচ্ছে সমাজের?গণ্যমান্যদের তো এসব বোঝানো না বোঝানো সমান।বোঝানো উচিত অশিক্ষিত মহিলা আর পুরুষদেরকে।যাদের জীবনে,চিন্তায় আর চেতনায় বিবাহই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।যারা বেচে থাকেন একটা কুসংস্কারের পরিমণ্ডলে।যারা ভাত-কাপড়টাকে জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে মনে করেন এবং মেয়ে মানুষদের সমাজ ও সংসারের বোঝা ভেবে অহেতুক একটি চিন্তার বোঝা নিয়ে দিনপাড় করেন।এদের কাছে তুলে ধরতে হবে নারীশিক্ষার গুরুত্ব আর বাল্যবিবাহের কুফল।কারণ যৌতুক প্রথাটাকে এরা জীবিত রেখেছেন।বাল্যবিবাহকে ইতিহাসে ঠাই নিতে দেননি এরা।যদিও শিক্ষিত ও ভদ্রসমাজ বাল্যবিবাহ থেকে কিঞ্চিৎ সরে আসলেও পরোক্ষভাবে যৌতুকের মাথায় জল ঢেলেই যাচ্ছেন।
আইনের ফাক ফোকরও যৌতুক ও বাল্যবিবাহের প্রসার ঘটাচ্ছে।
আইন করে বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথা নিষিদ্ধ করা হলেও আইনের প্রয়োগটা কোথায়?কতজন বাল্যবিবাহের জন্য শাস্তি পেয়েছেন আজ পর্যন্ত?কতজন জেলে গিয়েছেন যৌতুক প্রথার জন্য?কিছু সংখ্যক ন্যায় নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা হয়তো আছে।বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের জন্য মাঝে মাঝে পত্রিকায় ছাপানো হয় কেউ ধরা পরলো পুলিশের হাতে,শাস্তি পেলো আদালত থেকে।কিন্তু সংখ্যায় তো বেশি হয়ে যায় এই নিউজগুলো যেগুলোর শিরোনাম”যৌতুকের কারণে গৃহবধু খুন,বাল্যবিবাহের জন্য কিশোরীর আত্মহত্যা,সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কিশোরীর মৃত্যু “এসবই তো।
তাহলে আইনের সঠিক প্রয়োগটা কিভাবে করা হচ্ছে?
গ্রামে গঞ্জে এখনো অহরহ বাল্যবিবাহ দেয়া হচ্ছে।প্রভাবশালীদের পূর্ন ছত্রছায়ায় নিরাপদের সাথে বাল্যবিবাহ দেয়া হচ্ছে।থানা-পুলিশ টা দেখছেন গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আর তাদের উপস্থিতিতেই বেশ ধুমধামের সাথে দায়মুক্ত হচ্ছে শিশুকণ্যার বাবা মায়েরা আর দায়ভার মাথায় নিচ্ছে ছোট ছোট মেয়েরা।যারা দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্কুলে যায় আর স্কুলশেষে ছুটতে ছুটতে উদ্যোম মন নিয়ে বাড়ি আসে।
তাদের সেই উদ্যোম আর স্বপ্নের পায়ে বেরি পরিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে বাবার বাড়ি ছেড়ে শশুড়বাড়ির দিকে রওনা হতে হচ্ছে।তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় এই সমস্যা সেই সমস্যা।অন্তহীন সমস্যার কোনটার সমাধান তাদের হাতে থাকেনা।তাদের জোটে লাঞ্ছণা আর গঞ্জনা এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

অশিক্ষিত সমাজ আর কত বয়স হলে বুঝবে? আর কত জীবন নষ্ট হলে সমাজের চেতনা জাগ্রত হবে?কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে মেয়েদের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদেরও জীবন বিপন্ন হচ্ছে।অযাচিতভাবে অনেক ছেলেকেই পরিণত বয়সের আগেই বিয়ে দেয়া হচ্ছে।মতামতের তোয়াক্কা না করেই তাদেরও চাপিয়ে দেয়া হয় সংসারের বোঝা।দায় দায়িত্বের বোঝা। সমাজ আগাবে কিভাবে?দেশকে সামনে নিবে কারা?
শিক্ষিত আর ভদ্র সমাজেও স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়না অনেকেই।স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য তারাও যৌতুকের শিকার হন।তাদের যৌতুকটা একটু অন্য ধরণের হয়ে থাকে।দামি দামি উপঢৌকন,আসবাব,বিয়ের বিনিময়ে চাকুরি দেয়া এসবের রুপ নিয়েছে যৌতুক। তাদের যেন একটাই চাওয়া লেখাপড়া শেষে ভালো চাকরি।এমনভাবে ছেলেমেয়েদের মাথায় ঢুকানো হচ্ছে যে তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে ভালো চাকরি। আচ্ছা শিক্ষাটা কি এতটাই ঠুনকো?চাকরির পাল্লায় ওজন করার জিনিস?

শিক্ষা যে পরিপুর্ন জীবন গড়ার হাতিয়ার সেটা যেন শিক্ষার্থীদের বুঝতেই দেয়া হচ্ছেনা। খুব কম বাবা মা আছেন যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠান।যাদের উদ্দেশ্য ছেলেমেয়েদেরকে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি হওয়া নয়,উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত মানুষ হওয়া। আর বাকি সবারই একটাই চাওয়া চাকরি। শিক্ষিত সমাজ আর অশিক্ষিত সমাজের মানুষদের চাওয়া পাওয়া ভিন্ন।সীমাবদ্ধতা উভয় সমাজেই।
এত সীমাবদ্ধতা থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে কিভাবে? আমরা লেখাপড়া করছি মানুষ হবার জন্যে,বড় চাকরি পাবার জন্য নয়। আর হ্যা বিবাহ জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।জীবন অনেক অর্থবহ।জীবনে শিক্ষা আর জ্ঞান অর্জন করা সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য।সমাজকে এগিয়ে নেয়া নিজেকে দেশের জন্য প্রস্তুত করাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

About jne

Check Also

sayad

সন্তান লালনে গালমন্দ কাঙ্ক্ষিত নয়

মানুষ জন্মগতভাবে ভালো বা খারাপ বিষয়টি এমন নয়। যদিও মানুষ জন্মের সময় বাবা-মার কাছ থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *