প্রচ্ছদ / ব্যাংক ও বীমা / সহজে পাবেন পেনশন-ভাতা

সহজে পাবেন পেনশন-ভাতা

retirement

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা ও পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এ খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্ভোগ প্রতিরোধে পেনশন ও ভাতা প্রদান প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইনে করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে পেনশন কিংবা ভাতার অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি উপকারভোগীদেরে অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। পেনশন অফিস বানাচ্ছি। পেনশনার মারা গেলে তার স্ত্রীকেও আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। চেয়ারম্যান-মেম্বারের নিকট ধর্ণাও ধরতে হবে না। ফলে দুর্নীতিও থাকবে না সুবিধাভোগীরা পছন্দ মতো সোনালী, রূপালী, ডাচবাংলা ব্যাংক কিংবা রকেট ও শিওর যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভাতার টাকা গ্রহণ করতে পারবেন। ফলে ভাতাভোগীদের দুর্ভোগ যেমন কমবে তেমনি প্রতি বছর সরকারের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। যা দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ানো যাবে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পেনশনসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৬৮ লাখ। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা করা হবে। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হবে আরও ১০ লাখ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ বলছে, এসব অর্থ নগদ হস্তান্তরে ভাতাভোগীরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন। এমনকী প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে অন্যজনের অর্থ তুলে নেয়ার ঝুঁকিও থাকে। এছাড়া সরকারের নগদ ব্যবস্থানা ঝুঁকি এবং সরকারি ফান্ডের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা অধিক ব্যয় হয়। তাই অর্থ বিভাগ ভাতাভোগীদের ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে ভাতার অর্থ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি মাসে ভাতাভোগীর অর্থ পছন্দ মতো ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। একই সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থাপনাকেও অনলাইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে পেনশনার কিংবা তার স্ত্রীকে আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। তারাও তাদের ইচ্ছা মতো অ্যাকাউন্টে অর্থ পেয়ে যাবেন। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সচিব মো. মুসলিম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ইএফটির মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভাতার টাকা পাইলট হিসেবে দেয়া শুরু করেছি। আগামী অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এ খাতের সব অর্থ প্রদান ইএফটির মাধ্যমে হবে। ফলে প্রতি মাসের এক তারিখে ভাতাভোগী যে অ্যাকাউন্টে চাইবে সে অ্যাকাউন্টে অর্থ চলে যাবে। এক্ষেত্রে এজি অফিস অর্ডার করবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে উপকারভোগীর ইচ্ছা মতো অ্যাকাউন্টে অর্থ চলে যাবে। পেনশনও অনলাইনে করে দিচ্ছি। সব ভাতা পাবার ক্ষেত্রে এখন মানুষের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, পেনশনসহ ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ রয়েছে। এ অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উপকারভোগীর পছন্দ মতো অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। পেনশন অফিস বানাচ্ছি। পেনশনার মারা গেলে তার স্ত্রীকেও আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। চেয়ারম্যান-মেম্বারের নিকট ধর্ণাও ধরতে হবে না। ফলে দুর্নীতিও থাকবে না। এসব ক্ষেত্রে সরকারের কোনো পেমেন্ট রিসিটে চেক সিস্টেম থাকবে না। সব রিয়েল টাইম হয়ে যাবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বছরে ৫৪ হাজার কোটি টাকা সরকার বিভিন্ন অফিসের মাধ্যমে হাতে হাতে উপকারভোগীদের নিকট হস্তান্তর করে। বর্তমানে বেশকিছু অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে এসব ভাতার অর্থ দেয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোকে সুদসহ বিতরণকৃত অর্থ সরকারকে দিতে হয়। এতে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে সুদ হিসেবে দিতে হয়। কিন্তু এটা যদি সেন্ট্রালি এজি অফিস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা হয় তাহলে সরকারের সুদ বাবদ ওই ১০ হাজার কোটি টাকা বেঁচে যাবে। যা দিয়ে বর্তমানে যে পরিমাণ লোক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় রয়েছেন তার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ানো যাবে।

বর্তমানে বেশকিছু অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে এসব ভাতার অর্থ দেয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোকে সুদসহ বিতরণকৃত অর্থ সরকারকে দিতে হয়। এতে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে সুদ দিতে হয়

ইতোমধ্যে গত ১৭ মে অর্থ বিভাগ ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে প্রথামিকভাবে সাত উপজেলায় শুধু মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করেছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে- সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ), শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ), সাভার (ঢাকা), টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ), কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা), কালিয়াকৈর (গাজীপুর) ও ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অনলাইনের মাধ্যমে ওই সাত উপজেলার আট হাজার ৮১১ জন ভাতাভোগীকে জানুয়ারি থেকে মার্চ- এ তিন মাসে ১৫০০ টাকা করে প্রদান করেন। তাৎক্ষণিক ভাতাভোগীরা তাদের ইচ্ছা মতো ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, রকেট ও শিওর ক্যাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পেয়ে যান। আগামী জুন মাসে তাদের একইভাবে এপ্রিল থেকে জুন- এ তিন মাসের ভাতা দেয়া হবে।

এছাড়া আগামী জুন মাসে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ প্রাথমিকভাবে তিন জেলায় ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে দেয়া হবে। পাইলটিং হতে প্রাপ্ত ফিডব্যাকের ভিত্তিতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অন্যান্য সব উপজেলায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সব ধরনের ভাতা প্রদান করা হবে।

জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আগামী বাজেট সামনে রেখে আরও ১০ লাখ দরিদ্র জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে উপস্থিত অর্থমন্ত্রী ছাড়া বাকি সবাই আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাতা বাড়ানোর দাবি করেন। তবে অর্থমন্ত্রী জানান, ভাতা বাড়াতে হলে অনেক বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে এ খাতে বেশি অর্থের জোগান দেয়া কঠিন। পরে উপকারভোগীদের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভাতাও বাড়তে পারে। এ খাতে আগামী বাজেটে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এবার মাতৃত্বকালীন ভাতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আওতাও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে একজন দরিদ্র মা মাসিক ৫০০ টাকা মাতৃত্বকালীন ভাতা পান। এ ভাতা ৮০০ টাকা করা হচ্ছে

সূত্র মতে, এবার মাতৃত্বকালীন ভাতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তাদের আওতাও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে একজন দরিদ্র মা মাসিক ৫০০ টাকা মাতৃত্বকালীন ভাতা পান। এ ভাতা ৮০০ টাকা করা হচ্ছে। সারাদেশে এখন ছয় লাখ দরিদ্র মা মাতৃত্বকালীন ভাতা পান। আসন্ন বাজেটে এর আওতা আরও এক লাখ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে দুগ্ধদানকারী গরিব কর্মজীবী মা মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা পান। এটিও ৮০০ টাকায় উন্নীত হচ্ছে। এখন দুই লাখ উপকারভোগী এ কর্মসূচির আওতায় আছেন। এ সংখ্যা আরও ৫০ হাজার বাড়ানো হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও সুখবর থাকছে। মাসিক সম্মানী ভাতা না বাড়লেও সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বৈশাখী ভাতা পাবেন মুক্তিযোদ্ধারা। এর পরিমাণ মূল ভাতার ২০ শতাংশ। বর্তমানে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ভাতা ১০ হাজার টাকা। এ হিসাবে বৈশাখী ভাতা পাবেন দুই হাজার টাকা। বাজেটের পর আগামী জুলাই থেকে তা কার্যকর হবে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা দুই ঈদে সমপরিমাণ দুটি বোনাস পান। এ সুবিধা অব্যাহত থাকছে। বর্তমানে দেড় লাখ মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পান। আসন্ন বাজেটে এ সংখ্যা দুই লাখে উন্নীত হচ্ছে।

বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সবচেয়ে বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে বয়স্ক, বিধবা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি; ক্যান্সার, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তথা বেদে সম্প্রদায় ও তাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, হিজড়া জনগোষ্ঠী ও চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন অঙ্কের মাসিক ভাতা দেয়া হয়।

এর বাইরে ত্রাণ-দুর্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ২২ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় ১৩৬টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন। যেমন- পেনশন সুবিধা এক ধরনের সামাজিক কর্মসূচি। এতে বছরে সরকারের ব্যয় হয় ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আবার কম দামে গরিবদের চাল দেয়া, ভিজিডি, ভিজিএফ, ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ন্যাশনাল সার্ভিসের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা হয়।

মাসিক সম্মানী ভাতা না বাড়লেও সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বৈশাখী ভাতা পাবেন মুক্তিযোদ্ধারা। এর পরিমাণ মূল ভাতার ২০ শতাংশ

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ অর্থ এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরে এ খাতে সর্বমোট বরাদ্দ দেয়া হয় ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির আড়াই শতাংশ। আগামী বাজেটে এ খাতে মোট বরাদ্দ ৬৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

About jne

Check Also

q

ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভাতা বিতরণ চালু করলেন প্রধানমন্ত্রী

সামাজিক নিরাপত্তা বলয় কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের ভাতাসমূহ ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে (জিটুপি-গভর্নমেন্ট টু পারসন) বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *