প্রচ্ছদ / স্বাস্থ্য / প্রবীণদের চিকিৎসা প্রণোদনা ভাবনা

প্রবীণদের চিকিৎসা প্রণোদনা ভাবনা

probin

ডা. ছায়েদুল হক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা মানে সাধারণভাবে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা যা সবাই নিতে পারবে তার জন্য আর্থিক অনটনের ব্যাপারটি কোনোরকম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না। জাতিসংঘের সনদের ২৫নং আর্টিক্যালে মেডিক্যাল কেয়ার বা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে সেই ১৯৮৪ সালে।বাংলাদেশ হলো একটি স্বল্পোন্নত দেশ। এখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সরকারি এবং বেসরকারি উভয়বিদ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে নিজের পকেট থেকে খরচ হয় ৬৪ শতাংশ এবং সরকার বহন করে বাকি অংশ। কিছু ছিটেফোঁটা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বহন করে থাকে। সমাজের নিচের দিকে অবস্থানকারী প্রান্তিক দারিদ্র্যসীমার ২০ শতাংশ লোকের সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় তাদের মোট আয়ের ১৬.৫ শতাংশ। আবার ওপরের দিকে অর্থাৎ ধনী ২০ শতাংশ লোকের সরাসরি চিকিৎসা খরচ ৯.৫ শতাংশ। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় উন্নত দেশগুলোয় যেখানে গড়ে চিকিৎসা খরচ মোট আয়ের ২০ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে পরিবারগুলোকে তাদের মোট আয়ের ৪০ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ খরচ করতে হয় কেবল চিকিৎসকের ফি এবং ওষুধ কেনা বাবদ। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খরচ করতে হয় ১০.৬ শতাংশ। ২০১০ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ লোক আর্থিক সঙ্গতি না থাকার কারণে প্রয়োজন থাকলেও চিকিৎসা নিতে পারে না। প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৪ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।দেশে চিকিৎসা ও এর ব্যয় নির্বাহের এমন বেহাল অবস্থার পাশে আরও কিছু বাস্তবতা যুক্ত হয়েছে যা সমাজের এক বৃহৎ অংশের জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আপাত সচ্ছল এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে যেখানে এক বা একাধিক প্রবীণ সদস্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভুগছেন। যেমন দুরারোগ্য ক্যানসার, হার্টের রোগী, প্রেসার বা ডায়াবেটিসের জটিলতায় ভুগছেন এমন, স্ট্রোকের রোগী, কিডনি সমস্যায় ভুগছেন যার প্রায়ই ডায়ালাইসিস করাতে হয় এমন অথবা বয়সজনিত অন্যান্য জটিল সমস্যায় ভুগছেন এবং মাঝে মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় এমন সদস্য যে পরিবারে থাকেন সে পরিবারটি হাড়ে হাড়ে টের পায় চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ কতটা কঠিন একটি বিষয়। বাইরে থেকে মনে হতে পারে পরিবারটি বেশ সচ্ছল। সন্তান একটি নামিদামি স্কুলে পড়ে, গাড়ি করে স্কুলে যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভালো চাকরি করে। বাবা-মা কেউ একজন অসুস্থ। হঠাৎ অবস্থার অবনতিতে হাসপাতালে ভর্তি করে কয়েকদিন পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার সময় দেখা গেল লাখ লাখ টাকার বিল যার জন্য পরিবারটি মোটেই প্রস্তুত ছিল না। পরিবারটি সুন্দর গোছানো চললেও সঞ্চয় ছিল না। ব্যয় মেটাতে ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে হাত লোন বা অফিস থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে কোনোমতে সামাল দিলেও ভবিষ্যতের কথা ভেবে এক ধরনের অস্বস্তিতে পড়েন। এই ব্যয় নির্বাহের টানাপড়েন এক সময় পরিবারটিতে সম্পর্কের টানাপড়েনে পরিণত হয়। কারণ একলা যখন ব্যয় নির্বাহ করতে সমর্থ হবে না তখন পরিবারের অন্য সদস্যদের কতটুকু শেয়ার করবে বা অ্যাসেট বিক্রি করার প্রয়োজন হতে পারে এমন পরিস্থিতিতে মতানৈক্য দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক। চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতে না পারার কারণে অসুস্থ প্রবীণ সদস্য বাবা অথবা মা অনেক সময় অবহেলার শিকার হন।এ টি আসলে কারো কাম্য নয়। চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের এই যাতনা অনেক পরিবারকে কুরে কুরে খাচ্ছে।একজন নাগরিক সারাজীবন পরিবার এবং সমাজ বা দেশের জন্য কাজ করে বার্ধক্যে উপনীত হলো। তার সব সম্পদ সন্তানের লেখাপড়া, বিয়েশাদি এবং ছোট্ট একটা আবাসনের ব্যবস্থা করতেই নিঃশেষ হয়ে গেল। এখন হয়তো ছেলেমেয়ের সংসারে অবসরকালীন জীবনযাপন করছেন। তার চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে সন্তান সক্ষম হোক বা না হোক রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব অস্বীকার করবে? এটা কখনই হতে পারে না। কারণ এই রাষ্ট্র গঠনে ওই ব্যক্তি সারাজীবন শ্রম দিয়েছে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই এর দায় শোধ করতে হবে। তা ছাড়া শেষাবধি নাগরিকের কল্যাণই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়তে এবং সুস্থ-সুন্দর জীবনমান নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকারটি নিশ্চিত করতে হবে যেমনটি জাতিসংঘ সনদে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক দেশই স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত করেছে। বিষয়টি আমাদের মতো গরিব দেশের বেলায় আরও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশ যেখানে ২৫ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে; ১৫ শতাংশ লোক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ব্যয় নির্বাহ করার সামর্থ্য না থাকার কারণে চিকিৎসাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত সেখানে চিকিৎসা খরচ নির্বাহের দায়িত্ব রাষ্ট্র কীভাবে নেবে? রাষ্ট্রের কি সেই সক্ষমতা আছে? এটি কি আদৌ বাস্তবসম্মত?এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘মেডিকেয়ার’ নামের স্কিম চালু আছে। মেডিকেয়ার সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সের বেতন-ভাতাদিসহ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করে থাকে। এ ছাড়া প্রাইভেট চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিলে সেখানেও এর বেশিরভাগ অংশ মেডিকেয়ার বহন করে থাকে। এই মেডিকেয়ারের অর্থ করদাতাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। কর আদায়ের ক্ষেত্রে ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি আদায় করা হয় এবং স্বল্প আয়ের নাগরিককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ‘ফার্মাসিউটিক্যাল বেনিফিট স্কিম’ নামে একটি স্কিম আছে। এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে অর্থাৎ একটি আংশিক মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে (বাকিটা সরকার মেডিকেয়ারের মাধ্যমে বহন করে) স্কিমের আওতাভুক্ত যে কোনো ওষুধ যে কেউ পেতে পারে। ওই তালিকায় প্রায় ৬০০-এর মতো ওষুধ অন্তর্ভুক্ত আছে। আর এভাবে সরকার প্রায় ৬৭ শতাংশ চিকিৎসা খরচ বহন করে থাকে এবং বাকি অংশ রোগী নিজ পকেট থেকে বা অনান্য ইন্স্যুরেন্স বা বেসরকারি ফান্ড থেকে নির্বাহ করে থাকে। পুরো বিষয়টি মেডিকেয়ার কার্ডের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সরকার মেডিকেয়ারের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ চিকিৎসকের ফি এবং ওষুধ কেনা বাবদ খরচ মেটানোর চেষ্টা করে থাকে।আমরা মনে করি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা প্রদানের বিষয়টিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রবীণদের চিকিৎসা প্রণোদনা দিয়ে এটি শুরু করা যায়। এ ক্ষেত্রে আরও স্বল্পপরিসর যেমন ক্যানসার চিকিৎসা, হার্টের অস্ত্রোপচার, কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার যে কোনো এক বা একাধিক রোগের চিকিৎসা খরচের বিষয়ে স্কিম নেওয়া যেতে পারে। আবার ওই স্কিমটি প্রাথমিক অবস্থায় কেবল স্বল্পমূল্যে ওষুধ প্রাপ্তির বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে। শুরু করতে পারলে পরবর্তীকালে এর ব্যাপ্তি বাড়ানো কঠিন হবে না।

 ডা. ছায়েদুল হক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

About arthonitee

Check Also

IMG-20180131-WA0022

যশোরে নারী ফুল চাষীদের ক্যান্সার সচেতনতায় ক্যাপ( CAP)

জরায়ু মুখ ক্যান্সার সচেতনতা মাস জানুয়ারি উপলক্ষে নারীদের ক্যান্সার সচেতনতা মূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্যাপ যশোরের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *