প্রচ্ছদ / মতামত / কালোরাত্রির অন্ধকার যে আজো কাটেনি

কালোরাত্রির অন্ধকার যে আজো কাটেনি

hri

হৃদয় তালুকদার

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাতে বাঙ্গালীর ওপর নেমে আসে কালের ছায়া।কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিলো নিরীহ বাঙ্গালীদের।পাকিস্তানী হায়েনারা চেয়েছিলো হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে বাঙ্গালীর অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে।সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরেছিলো সেদিন তারা।ঘুমের প্রহর শুরু হতে না হতেই বুলেটের আঘাতে কালঘুমে যেতে হয়েছিলো সেদিন অসংখ্য বাঙ্গালীকে।অবশ্য সেদিনই ছিলো সুচনা।অশুভ শক্তির পাকিস্তানী শকুনীদের বীভৎস হত্যাযজ্ঞের সুচনা হয়েছিলো ২৫ মার্চের রাত থেকেই।তারপর পুরো ৯ টা মাস।হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি পশ্চিমা ডাকাতেরা।লুটতরাজ,ধর্ষণ সবই করেছিলো তারা।উদ্দেশ্য ছিলো একটাই।বাঙ্গালীর কণ্ঠকে চিরতরে রোধ করা।
হত্যা করতে করতে রক্তের নদী বয়ে গেলো তবুও বাঙ্গালীর কণ্ঠরোধ হলোনা।সেই বজ্রকণ্ঠ যেটা ৭ মার্চ রেসকোর্সে তারা শুনেছিলো তাতেই তো রক্তে আগুন লেগে যায়।বাঙ্গালী ক্ষান্ত হবে কিসে?

২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে হত্যা করা হয়েছিলো অসংখ্য বাঙ্গালীকে কিন্তু পাকবাহিনী হত্যা করতে পারেনি আমাদের চেতনাকে আমাদের জাতীয়তাকে। সেদিনের শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞ যত বৃদ্ধি পাচ্ছিলো তার চেয়ে সহস্রগুন বেড়ে চলছিলো বাঙ্গালীর বীরদর্প।আমরা মরেছিলাম কিন্তু রণে ভঙ্গ দেইনি।আমরা বীরের জাতি।মৃত্যু আমাদের দমাতে পারেনি।যন্ত্রণা,হাহাকার,লাঞ্ছণায় ৭১ এর বাংলাদেশ প্রকম্পিত হয়েছিলো।কত বোনের ইজ্জত,মায়ের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছিলো পাক হানাদারেরা।কিন্তু আমরা তাদের ঠেকিয়েছিলাম লাঠি দিয়েই।ওরা জিততে পারেনি আমাদের বাশের লাঠির কাছে। বাংলার কৃষাণ,বাংলার শ্রমিক,বাংলার দামাল ছেলেরাই তখন জবাব দিয়েছিলো পাকস্তানী শকুনদের। রেসকোর্সের ময়দান থেকে বজ্রধ্বনি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি।”তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে”। বাঙ্গালী মান রেখেছিলো সেই কথার। সেদিন বাঙ্গালীর অস্ত্রের জোর ছিলোনা,ছিলো মনের জোর।ছিলো মাতৃভুমির প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা।ছিলো মায়ের প্রতি টান,ছিলো বোনের প্রতি মমতা।তাই শত নির্যাতনেও ছুটে গিয়েছিলো তারা।যার যা কিছু ছিলো তাই নিয়েই শত্রুর পানে ছুটে গিয়েছিলো তারা।কেউ মার খেয়েছে,কেউ মরেছে,কেউবা রক্তাক্ত হয়েছে,আবার কেউ নিখোজ হয়েছে।তবুও এতটুকু কমেনি উদ্দীপনা আর তেজস্বীতা।”রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো,তবুও এদেশকে স্বাধীন করেই ছাড়বো ইনশাল্লাহ্”।সেই উক্তিটি যে বাঙ্গালী অন্তরে গেথে নিয়েছিলো।

সেদিন বাঙ্গালীর ছিলো নিজস্বতা।ছিলো স্বজাত্যবোধ,ছিলো ভ্রাতৃত্ববোধ।তাই মুখ লুকিয়ে বসে থাকতে পারেনি বীর বাঙ্গালীরা।রক্ত,জীবন সবকিছু তুচ্ছ করে দিয়েছিলো দেশের জন্য। ভয়ঙ্কর কালো রাত্রি যখন অন্ধকারের অমানিশা নিয়ে এসেছিলো তবুও বাঙ্গালী সেদিন আলোর খোজ করেছিলো।খোজ করতে করতে আলোর দিশা ঠিকই পেয়েছিলো তারা।
রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো রাজপথ,মৃত্যুর দূত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো প্রাণ নিতে নিতে তবুও ক্ষান্ত হচ্ছিলো পাকিস্তানী শকুনেরা।রক্ত চাই ওদের।শুধু রক্ত। বাঙ্গালী সাগর সাগর নদী নদী রক্ত দিয়েছে।রক্তে বাংলা লাল করে ফেলেছে।তবুও দমেনি। বাঙ্গালী দমার নয়।

বজ্রকণ্ঠের আকুতি “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল″।
বাঙ্গালী প্রাণের বিনিময়ে সেই আকুল আবেদনে সাড়া দিয়েছে।রক্ষা করেছে পথের দিশারীর হুকুম।
২৫ মার্চের কালোরাত্রি এনে দিয়েছিলো দীর্ঘ ২৬৬ দিনের অন্ধকার রাত্রি।পথের প্রদর্শক স্বাধীনতার ঘোষক মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে আমাদের করেছিলো নেতৃত্ব শূণ্য।দিয়েছিলো ৩০ লক্ষ মৃত্যু,করেছিলো ২ লক্ষের অধিক মা-বোনের ইজ্জতহানী।দিয়েছিলো রক্তাক্ত বাংলা।বাঙ্গালীকে করেছিলো ক্ষত-বিক্ষত।সেই কালোরাত আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছিলো।মাকে করেছে সন্তানহারা।বোনকে করেছে ভাইহারা।নববধুকে দিয়েছে বৈধব্যের যন্ত্রণা।এনে দিয়েছিলো আমাদের ললাটে পাশবিকতা।
বাংলাদেশকে বানিয়েছিলো মৃত্যুপুরী।সেই পাশবিক মৃত্যু যেন সাগরের ঢেউকে থামিয়ে দেয়।তবুও সেই অন্ধকারে পথ হারায়নি বাঙ্গালী।কারণ ৭ তারিখেই পথের দিশা পেয়ে গেছিলো তারা।

রক্ত,মৃত্যু আর ইজ্জত নিতে নিতে ১৪ ডিসেম্বরে এসে হায়েনার দল কেড়ে নেয় আমাদের অমূল্য রতন বুদ্ধিজীবী আর নামিদামি লোকদের।হীরা মানিকের চেয়েও যারা দামি ছিলো।যাদের কলমের বাণে বিশ্ব কেপে উঠতো তাদের কে কেড়ে নিয়ে গেলো আমাদের কাছ থেকে।তবুও পারেনি মাকে কেড়ে নিতে।সন্তানরা মা কে নিতে দেয়নি ওদের। রক্তের বানে ভাসতে ভাসতে মৃত্যুর সাগর সাতরে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর সকালে বাংলার বীরেরা মুক্ত করে স্বদেশ।পালিয়ে যায় শত্রু সেনার দল। কত ত্যাগ,সীমাহীন কষ্ট আর মৃত্যুর বিনিময়ে পেলাম স্বাধীন বাংলা।

কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও বাংলার আকাশে কোন এক ইশাণ কোণেতে একটুকরো অন্ধকার এখনো জমে আছে।কেটে যায়নি সেই কালো ছায়া সম্পূর্ণরুপে।এত রক্ত,এত যন্ত্রণা আর এত মৃত্যুর পরেও কালোরাত্রির সেই অন্ধকার এখনো কাটেনি।ব্যর্থতা আমাদের।লজ্জ্বা আমাদের।আর কত লজ্জিত করবো আমরা বাংলা মা কে?
আজো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটাক্ষ হয়!হেয় আর লাঞ্ছিত করা হয় মহান মুক্তিযোদ্ধাদের!বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে কটুক্তি করা হয়!বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটাক্ষ করা হয়।যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বাঙ্গালী জাতির জনক তাকে নিয়ে মিথ্যা কটুক্তি করা হয়।তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বজ্রকণ্ঠের মান কোথায় রাখছি আমরা?ব্যর্থতা আমাদেরই।
তাহলে কি লাভ হলো এত জীবন দিয়ে?

কলঙ্কিত হতে হতে আর কত হবো কলঙ্কিত আমরা? যারা দেশ রক্ষা করলো,যারা প্রাণ বিলিয়ে দিলো তাদের যখন উপহাস করা হয় তখন আমাদের মানটা আর কোথায় দাড়ায়? এত বছর পরে এসে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ বাংলাদেশ পাচ্ছেনা।কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।স্বাধীনতাবিরোধীরা আজো সক্রিয়।তাদের উদ্দেশ্য একটি পাকিস্তান দেখা বাংলাদেশের বুকে।জাগ্রত শহীদ মিনার তাদের পরম শত্রু।তারা নস্যাৎ করে দিতে চায় মহান স্বাধীনতাকে।অত্যন্ত লজ্জার বিষয় তাদের অপকৌশলে জড়িয়ে গেছে আমাদের অনেক তরুণ ভাই বোনেরা।এ লজ্জা অামরা রাখবো কোথায়? আজো আমরা অনেক মানুষ অনাহারে থাকি।বস্ত্রহীন হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকে কত অভাজন।ধুকে ধুকে মরছে কত অসহায় মানুষ!
৭১ এর চেতনায় ফিরে গেলেই আমরা এদের পাশে দাড়াতে পারি। কিন্তু সেই চেতনাকে আমরা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি।আজো সমাজে
আমাদের সাথে আমাদের কত ব্যবধান,কত বৈষম্য। কত ক্ষুধা,কত কান্না কত হাহাকার চারপাশে। আমাদের যেন কোনরকম দায়ই নেই।
ছোট ছোট মানুষের অন্ন কেড়ে সমাজপতিরা বড় হচ্ছে। দেখার কেউ নেই বলার কেউ নেই।
২৫ মার্চের কালোছায়ার আরেক রুপ এসব জরা,কান্না,হাহাকার আর বৈষম্যগুলো। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি,সামাজিক মুক্তি,রাজনৈতিক মুক্তি
যেদিন পরিপূর্নভাবে আসবে সেদিনই হয়তো বাংলার আকাশ থেকে কালোরাত্রির সেই কালো মেঘ কেটে যাবে।
স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশের জন্য, বাঙ্গালী জাতির জন্য আবারো ৭১ এর চেতনা ফিরে আসুক। আসুন আমরা আবারো ফিরে যাই সংগ্রামের পথে জাতির পিতার দেখানো পথে।যে পথ দুর্নীতির বিরুদ্ধে, ক্ষুধার বিরুদ্ধে,অন্যায়ের বিরুদ্ধে,দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আসুন সবাই মিলে কাধে কাধ মিলিয়ে একসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গর্জে উঠি আরেকবার।

About arthonitee

Check Also

yousuf photo popular

প্রাণের শহর কুমিল্লা নিয়ে কিছু কথা….

এস এন ইউসুফ রাজধানী ঢাকার পাশে যে ক‘টি উন্নত জেলা রয়েছে তার মধ্যে কুমিল্লা অন্যতম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *