প্রচ্ছদ / মতামত / সন্তান লালনে গালমন্দ কাঙ্ক্ষিত নয়

সন্তান লালনে গালমন্দ কাঙ্ক্ষিত নয়

sayad

মানুষ জন্মগতভাবে ভালো বা খারাপ বিষয়টি এমন নয়। যদিও মানুষ জন্মের সময় বাবা-মার কাছ থেকে ক্রোমোজম বা ডিএনএর মাধ্যমে কিছু বৈশিষ্ট্য বা গুণাগুণ নিয়ে জন্মায়। এই ডিএনএ মানবজীবনের বৈশিষ্ট্যগুলোর এক বিশাল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তবুও কথা থেকে যায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ যখন যেখানেই জন্ম নিক তার ভেতরে এক ধরনের প্রবৃত্তি কাজ করে থাকে। এটাকে আমরা আরবি ভাষায় নাফ্স, ইংরেজিতে সোল বা ইনস্টিংক্ট, বাংলায় আত্মা বা বিবেক এ রকম কাছাকাছি শব্দ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে থাকি। একজন মানুষকে পরিপূর্ণ সুন্দর মানুষ হতে হলে তার আত্মা বা নাফ্্সের এক ধরনের উন্নতি সাধিত হওয়া জরুরি। যেমন প্রাথমিক স্তরে বা শিশু অবস্থায় নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর মানুষের তেমন একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ভালো-খারাপ নির্ধারণ করার চেয়ে নিজের ভালো লাগার ওপর ভিত্তি করেই কাজ করতে উদ্যত হয় এবং কাজ শেষে এ নিয়ে আর তেমন একটা ভাবে না। কাজটি খারাপ হলেও এর জন্য কোনো অনুশোচনা তার মধ্যে কাজ করে না। দ্বিতীয় পর্যায়ে মানুষ তার প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে অর্থাৎ নিজের কাজের ভালো-মন্দ বিচার করার চেষ্টা করে থাকে। এই স্তরে উত্তীর্ণ হলে একজন মানুষ তার ভালো কাজের জন্য তৃপ্তিবোধ করার পাশাপাশি খারাপ কাজের জন্য অনুশোচনায় বিদ্ধ হয়। বলা যায়, মানুষটি বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন বা তার মধ্যে কনসাইন্স কাজ করে। এই স্তরে উন্নীত হলে একজন মানুষ হুট করে একটি খারাপ কাজ করে ফেলতে পারে না বা করলেও তার জন্য অনুতপ্ত হয়। তৃতীয় ধাপে মানুষ তার ইন্দ্রিয় বা নাফ্্সের ওপর সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয় এবং সে সব সময় ভালো কাজের ওপর স্থায়ী থাকে। এই স্তরে উন্নীত কাউকে দিয়ে কোনো খারাপ কাজ করানো প্রায় অসম্ভব। এই স্তরে একজন মানুষ সর্বদা এক ধরনের প্রশান্তিতে থাকে। সন্তান শিশু অবস্থায় যেহেতু প্রাথমিক স্তরে থাকে এবং ভবিষ্যতে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হতে হলে তার উত্তরণ দরকার। আর এই উত্তরণের জন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিচর্যা। তাই সন্তান লালন-পালনের গুরুত্ব এত বেশি। আর এই কাজটি প্রাথমিকভাবে বাবা-মার ওপরই বর্তায়।
বাবা-মার উচিত সচেতনভাবে দায়িত্বটি পালন করা। কারণ সন্তান লালনে ত্রুটি থাকলে এর ক্ষতিকর প্রভাব সন্তানের চরিত্রে স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হয়, যার পরিণাম সারাজীবন সন্তান, ওই পরিবার এবং সমাজকে বয়ে বেড়াতে হয়। তাই সন্তান লালনের বিষয়টি নেহাত ভাগ্যের ওপর ছেড়ে না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে পালন করতে হবে। প্রয়োজনে সন্তানকে শাসন করতে হবে। এই শাসন করতে গিয়ে অনেক বাবা-মা অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করে থাকেন। যেমন চিৎকার-চেঁচামেচি, গালমন্দ, অভিসম্পাত, এমনকি মারধর পর্যন্ত করে থাকেন। এভাবে প্রচ- রকম শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন কতটুকু বিপদ ডেকে আনে তা অনেক বাবা-মাই বোঝার চেষ্টা করেন না। সন্তান লালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যেন সন্তান ভালো-মন্দ বুঝতে সক্ষম হয় এবং তদনুরূপ চর্চা করতে পারে এবং বড় হয়ে নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন সন্তানের ওপর একটি কার্যকর শাসনব্যবস্থা, যেটি প্রতিনিয়ত কার্যকর থাকবে। সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখার বিষয়টি খুবই জরুরি। এমন নয় যে, সব সময় সন্তানের ওপর খবরদারি করতে হবে। যেটি প্রয়োজন সেটি হলো সন্তানকে পরিষ্কার করে ভালো-মন্দ বুঝিয়ে দিতে হবে। কোন কাজটি করণীয় অথবা বর্জনীয় তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজন হলে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। এটি হবে একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। এই শাসনব্যবস্থার মূলে কাজ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। শাসন প্রক্রিয়াটি যত বেশি শ্রদ্ধার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে তত বেশি এটি সন্তানকে প্রভাবিত করবে। এই জায়গাটায় অনেক বাবা-মা ভুল করে বসেন। মনে করেন সন্তানের আবার সম্মান কী? বাবা-মা যা বলবে সন্তান তাই করবে। সন্তানকে শাসন করা বাবা-মার এখতিয়ার। তা ছাড়া এটি তারা সন্তানের ভালোর জন্যই করেন। বাবা-মায়ের ইচ্ছায় কোনো গলদ না থাকলেও প্রক্রিয়াটি আদৌ সঠিক নয়। বর্তমানে বিভিন্ন গবেষণায় এটি প্রতিষ্ঠিত মারধর করে এবং গালমন্দ করে সন্তানের মেজাজ খিঁচরে দিয়ে সাময়িক কিছুটা আনুগত্য পাওয়া যায় বটে তবে দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের মনে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন এদের ভেতর উগ্র স্বভাব ও অসামাজিক কাজের প্রতি অধিকতর স্পর্শকাতরতা দেখা দেয়। আবার যেসব সন্তান শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতনে অভ্যস্ত হয়ে বেড়ে ওঠে তারা বড় হয়ে অনুরূপ আচরণ করে থাকে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বা বিবাহিত সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে। এ ছাড়া এসব শিশু অধিকতর বিষাদগ্রস্ততা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ততা, অসুখীবোধ করা বা অসহায়বোধ করা, নেশাগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদির ঝুঁকিতে থাকে। আর এসব ক্ষেত্রে বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের শৈথিল্যতা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে। তাই বিষয়টির দিকে অবশ্যই বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে। শিশু যদি বাবা-মাকে খুব ভয় পায়; বাবা-মা সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে; বাবা-মার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের কারণে সে নিজের সম্পর্কে হীন ধারণা পোষণ করতে শুরু করে অর্থাৎ বন্ধু-বান্ধবদের চেয়ে সে হীন বা অক্ষম এবং নিজেকে নিষ্প্রভ মনে করে তবে বুঝতে হবে সন্তানের ওপর বাবা-মার নির্দয় আচরণ গভীর রেখাপাত করছে। দাম্পত্য কলহে আক্রান্ত দম্পতি এবং মাদকাসক্ত বাবা-মার ক্ষেত্রে এটি ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনে। এই অবস্থার জরুরি পরিত্রাণ দরকার।
বাবা-মাকে বিশ্বাস রাখতে হবে, গালমন্দ বা মারধরের আশ্রয় না নিয়েও সন্তানকে বাগে রাখা যায়। তার জন্য বাবা-মাকে সন্তান লালনের বিষয়টিকে একটি সার্বক্ষণিক বিষয় হিসেবে ভাবতে হবে। এটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সন্তানকে পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দিতে হবে, কোন কাজটি ভালো আর কোন কাজটি খারাপ; কোন কাজটি করা উচিত, কোন কাজটি পরিহার করতে হবে। সন্তান ভুল করলে তার শাস্তিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে সে যেন ওই কাজটি দ্বিতীয়বার না করে তার জন্য তাকে বোঝাতে হবে এবং এটিকে অবশ্যই ফলোআপ করতে হবে। উত্তম হবে ভুল কাজটি করা থেকে সন্তানকে বিরত রাখা।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ১৯ অনুচ্ছেদে শিশুর প্রতি আচরণ সম্পর্কে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র, পিতামাতা, আইনানুগ অভিভাবক বা শিশু পরিচর্যায় নিয়োজিত অন্য কোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় শিশুকে আঘাত বা অত্যাচার, অবহেলা বা অমনোযোগী আচরণ, দুর্ব্যবহার বা শোষণ এবং যৌন নিপীড়নসহ সব রকমের শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য যথাযথ আইনানুগ, প্রশাসনিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত ব্যবস্থা নেবে।’ এর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে হবে বাবা-মাকে।
ডা. ছায়েদুল হক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

About arthonitee

Check Also

hri

আমাদের অগ্রগতি কোথায়????

হৃদয় তালুকদার: শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানোর চেষ্টায় বাংলাদেশ।আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রয়াস নিয়েই শিক্ষার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *