প্রচ্ছদ / মতামত / বাংলাদেশ-আমার অহংকার

বাংলাদেশ-আমার অহংকার

Qantara-khan

কানতারা খান:
অনেক রক্ত, ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে আমাদের আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। খুব সহজে পাইনি এই দেশকে। অস্তিত্বের জন্য লড়াই শুরু করেছি ১৯৪৮ সাল থেকে, সে ছিল ভাষার লড়াই। পরবর্তীতে ছয় দফা ও একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস, সাড়ে সাত কোটি মানুষ, শুধুমাত্র একটি তর্জনীর নির্দেশে, একটি মানুষের বিশ্বাসে, একটি মানুষের স্বপ্নের উপর ভরসা করে, নিজেদের যা কিছু ছিল তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পথের শেষ কোথায়, জীবন না মৃত্যু, পাওয়া না পাওয়া- কোনো হিসেবে নিকেষ ছাড়াই যুদ্ধ করেছিল।

সেদিন প্রতিটি দেশপ্রিয় বাঙালি, অকাতরে জীবন দিয়েছিল নিজের লাল সবুজের পতাকা আর মাতৃভূমির জন্য। তবে সেইদিনও কিছু মানুষরূপী পশুর অন্য রূপ আমরা দেখেছি। আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এখনো তাদের নমুনা আমরা দেখতে পাই।

দুই তিন দিন আগের কথা। দেশের অভ্যন্তরীণ আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জার। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন, বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র রূপ। সেখানে যেয়ে কিছু বিএনপি সমর্থক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

হাইকমিশনে স্মারকলিপি জমা দিতে গিয়ে তারা কমিশনের ভেতরে হামলা চালান। আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। বিক্ষোভকারীরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দেওয়াল থেকে নামিয়ে, মাটিতে ফেলে তাদের অসম্মান করেন। দীর্ঘ এই অরাজকতা চলার পর পুলিশ এসে বিক্ষোভ ভেঙে দেয়।

বিএনপির এক নেতা নাসির আহমেদ শাহিনকে গ্রেফতার করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। বিএনপির এই নেতা পুলিশকে জানান, তারেক জিয়ার নির্দেশেই তারা বিক্ষোভ এবং অরাজকতা করেছেন। ঘটনার পর বাংলাদেশ হাইকমিশন, তারেক জিয়াকে প্রধান আসামি করে ৫০ জনের বিরুদ্ধে লন্ডন পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করে।

যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি, সেখানে এইরকম একটি ঘটনা দেশের জন্য কি কোনো সুনাম বয়ে আনবে? এই ধরনের অভদ্রতা কি বোঝায়? দেশকে, জাতির জনক’কে, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অবজ্ঞা, অসম্মান করে তারা কি কোনভাবে নিজেরা সম্মানিত হলো, না নিজের দেশকে সম্মানিত করলো?

তারা কি এটাই প্রমাণিত করলো না যে, তারা নিজেদের দেশকেও ভালোবাসে না।

একটি রায় কি দেশের চেয়ে বড় হলো? বিদেশের মাটিতে দেশকে ছোট করার অধিকার কোনো দল, কোনো দলের নেতা কিংবা তাদের সমর্থকদের কে দিলো? আমরা, এদেশের জনগণ তো দেইনি। এতো কষ্টে অর্জিত দেশের সম্মান নষ্ট করার অধিকার কারো নেই।

এখন আসি সেই রায় প্রসঙ্গে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা এই মামলায় এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করেন। এতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন- দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারমান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৯১-৯৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন খালেদা জিয়ার পক্ষে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। যার চলতি হিসাব ৫৪১৬। ওই একাউন্টে ৯ জুন ১৯৯১ সালে এক সৌদি দাতার পাঠানো ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলার যার মূল্য তৎকালীন বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে বাংলাদেশি টাকায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা অনুদান হিসেবে জমা হয়। ৯ জুন ১৯৯১ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ পর্যন্ত সেই অর্থ কোনো এতিম খানায় দান করা হয়নি। এই সময়ের মধ্যে তারেক রহমান, তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ‌’জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। এখন দেখুন, এক এক করে কিভাবে চালাকির সঙ্গে এই টাকাগুলোকে সরানো হয়েছে।

১. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ৫০ লাখ টাকা সাবেক এমপি কাজী সলিমুল হকের নামে ২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অ্যাকাউন্ট থেকে ট্রান্সফার করা হয়।

২. এই শাখায় কাজী সলিমুল হকের নামের পরিবর্তে ২ কোটি টাকার আরো দুটি এফডিআর খোলা হয়। যা তিনি নিজ নামেই ট্রান্সফার করেন।

৩. ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ আহমেদের নামে একটি এক কোটি টাকা এবং দুজনের যৌথ নামে আরেকটি ১ কোটি টাকার এফডিয়ার খোলেন কাজী সলিমুল হক।

৪. এই দুই এফডিয়ার থেকে গিয়াসউদ্দিন উদ্দিন আহমেদের এফডিআরে ট্রান্সফার হয়। কিছুদিন পরই গিয়াস উদ্দিন আহমেদ তার এফডিয়ারের এক কোটি টাকা ভেঙে ৫০ লাখ টাকার ২টি এফডিয়ার করেন।

৫. এরপর আবার সেই এফডিয়ার ভেঙে শরফুদ্দিনের অ্যাকাইন্টে ৬টি পে অর্ডারের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফার করেন।

৬. ট্রাস্টের কাজে শরফুদ্দিন আহমেদ ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা তুলে নেন। এই টাকাটি আত্মসাতের অভিযোগেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করে দুদক।

দীর্ঘ ১০ বছর ধরে পুরান ঢাকার বকশিবাজারের বিশেষ জজ আদালতে এ মামলাটি চলে এবং সব শেষে ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মামলার রায় হয়। রায়ে বেগম জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, তারেক জিয়াসহ বাকি ৪ জনের ১০ বছর কারাদণ্ডসহ প্রত্যেককে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এতো স্বচ্ছভাবে সবকিছু উল্লেখিত থাকার পরও, জেগে থাকা ঘুমন্ত বিএনপি সমর্থকেরা কিছুই দেখতে পায় না, কোনো দুর্নীতি, কোনো অন্যায় তাদের চোখে পরে না। এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ করা তাদের চোখে কোনো ভুল কাজ নয়। এই অপরাধের বিচার তাদের পছন্দ নয়। তারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে, দুর্নীতিকেই বেছে নিতে চান। আর দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে সবসময়ের মত অন্ধকারে পেছনের দরজা দিয়ে প্রয়োজনে নিজেদের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন এনে হলেও দুর্নীতিবাজদের সমর্থন করেন। আর সেই ধারাবাহিকতায়, বেগম জিয়া জেলে থাকা অবস্থায় একই মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আরেকজন দুর্নীতিগ্রস্ত তারেক জিয়াকে দলের চেয়ারপারসন মনোনীত করা নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। আজব ব্যাপার!

অবশ্য অবাক হলে চলবে না। কেননা মনে রাখতে হবে, বিএনপিই সেই দল, যারা প্রশ্ন করে ৭১ এ মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে। সন্দেহ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে। বিএনপি এখনো গলাবাজি করে যে, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। ভুলে গেলে চলবে না, আজো আমাদের আবেগকে লাথি মেরে পাকিস্তানী জেনারেলের মৃত্যুতে শোক বার্তা পাঠায় বেগম জিয়া। যে রাজাকাররা এদেশের মেয়েদের পাকসেনাদের হাতে তুলে দিতো, বুদ্ধিজীবীদের যারা তালিকা করে খুন করতো তাদের গাড়িতে রক্তমাখা লাল সবুজের পতাকা তুলে দিয়েছে এই বিএনপিই। আর কিছুদিন আগেই, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত সাকা চৌধুরীর নামে শোক প্রস্তাব এনে বিএনপি বরাবরের মত প্রমাণ করলো তাদের দল এখনও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী চেতনায় নয় পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী।

প্রশ্ন আমার একটাই, বিএনপির মধ্যে যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বা যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, আপনারা কি ঘুমিয়ে আছেন, না মরে গেছেন, আপনাদের বিবেক কি কিছুই বলে না?

এই ধরনের একটি দল ও তাদের সমর্থকদের কাছ থেকে আর কিইবা আশা করা যায়? এই দলের নেতা দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় (এসাইলাম) নিয়ে বসবাস করেন। কদিন আগে খবরের কাগজে পড়লাম, তিনি নিজেই যুক্তরাজ্য ইমিগ্রেশন বিভাগকে জানিয়েছেন, তার আয়ের উৎস নাকি বেটিং (বাজি) এবং ক্যাসিনো (জুয়া) খেলা। আমি আর কি বলবো। আই রেস্ট মাই কেস। বর্তমানে তিনি নাকি দলটির কর্ণধার। তবে দলের অবস্থা বুঝুন এবার।

আমার কাছে শুধু একটা বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আমার, আপনার, আমাদের। অনেক রক্তের দামে কেনা এই ভাষা, সম্ভ্রমের ত্যাগে রঞ্জিত লালসবুজের পতাকা, প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। তিলে তিলে গড়া, বিশ্ব দরবারে আমাদের আজকের অবস্থানকে আমরা পদদলিত হতে দিবো না কারো হাতে। বীর বাঙালি সবসময় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, প্রতিবাদ করেছে। আজও পিছপা হবো না আমরা।

৭১ এ যেই ‘জয় বাংলার’ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমরা সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে জয় এনেছি, আজো সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা লড়বো। বিচার চাই আমরা, সেই সকল বিএনপি নেতাকর্মীদের, যারা অবমাননা করেছেন জাতির জনকের, দেশের প্রধানমন্ত্রীর, যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে, যারা বাংলাদেশকেই বিশ্বাস করে না তাদের।
তারা প্রমাণ করেছেন এই দেশ তাদের নয়, এই পতাকা তাদের নয়, তার ভিনদেশি, পাকিস্তানি প্রেতাত্মা। তাদের বিচার চাই আমরা।

কারণ একটাই, সব কিছুর ঊর্ধ্বে, সব কিছুর বিনিময়ে, প্রতিটি দেশপ্রেমিক স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালির বুকে আমরা ধারণ করি শুধু একটাই বিশ্বাস- বাংলাদেশ, তুমি আমার অহংকার।

লেখক: কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।

About arthonitee

Check Also

delwar

রাজনৈতিক জেনারেল খোন্দকার দেলোয়ার

অ্যাড. জয়নাল আবেদিন মেজবাহ আজ বিএনপির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার স্যারকে খুব মনে পরছে।তাঁর আদর, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *