প্রচ্ছদ / স্বাস্থ্য / এইডস, স্বাস্থ্য অধিকার ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

এইডস, স্বাস্থ্য অধিকার ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

aids

ডা. মো. ছায়েদুল হক:
এইচআইভি বা এইডস। প্রাণঘাতী এক নির্মম মরণব্যাধির নাম। এইচআইভি মানে হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস আর এইডস মানে অ্যাকুয়ার্ড ইমিউনডেফিসিয়েন্সি ডিজিজ। অর্থাৎ এইচআইভি ভাইরাসজনিত একটি রোগের নাম হলো এইডস। ১৯৭০ সালে প্রথম ব্যাপক হারে মানবদেহে ভাইরাসটির অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। যদিও তার অনেক আগে থেকেই মনে করা হয়, ১৯২০ সাল থেকে এটির অস্তিত্ব বানর বা সিম্পাঞ্জির দেহে বিদ্যমান ছিল। সিম্পাঞ্জির দেহ থেকে মানবদেহে এর সংক্রমণ হয়। তবে ১৯৭০ সালের আগে কী পরিমাণ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল তা বলা সম্ভব হয়নি। ১৯৭০ সালে প্রথম ব্যাপক হারে এর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গেলেও ১৯৮০ সালে বিভিন্ন মহাদেশে এটি ছড়িয়ে পড়লে প্রথম এটিকে বিশ্বব্যাপী এক নতুন স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯১৬ সালে বিশ্বে এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৬.৭ মিলিয়ন; ৩৪.৫ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২.১ মিলিয়ন শিশু। এর মধ্যে নতুন আক্রান্ত রোগী ১.৮ মিলিয়ন এবং মৃতের সংখ্যা ১ মিলিয়ন। ১৯৭০ সালের প্রথম প্রাদুর্ভাব থেকে ২০১৬ সাল নাগাদ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬.১ মিলিয়ন এবং মৃতের সংখ্যা ৩৫ মিলিয়ন।
প্রাথমিক অবস্থায় যখন এইচআইভি দেহে সংক্রমিত হয় তখন কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে অথবা সর্দিজ্বরের মতো উপসর্গ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়ে ভালো হয়ে যায়। তার পর এক লম্বা বিরতি। প্রায় ১০ বছর কোনো উপসর্গ ছাড়াই চলে যায়। অথচ এই সময়টাকে বলা যায় দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে ভাইরাসের ঠা-া লড়াই। এর মধ্যে যদি ভাইরাসের সংক্রমণের ব্যাপারটি শনাক্ত না হয় এবং কোনো চিকিৎসা ছাড়া চলতে থাকে তবে দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। ফলে দেহে সংক্রমণের চূড়ান্ত উপসর্গগুলো জেঁকে বসে। যেমনÑ ওজন কমে যেতে থাকে; জ্বর, সর্দিকাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদি দীর্ঘদিন ধরে লেগেই থাকে। শরীর দুর্বল হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম হয়ে পড়ে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমনÑ চোখ, লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক ইত্যাদিতে বারবার প্রদাহ দেখা দেয়। উপসর্গের এ চূড়ান্ত পর্যায়কে বলা হয় এইডস। এর পর শুধুই মৃত্যুর প্রহর গোনা অথবা অথর্ব জীবনের গ্লানি বয়ে বেড়ানো।

এইডস ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে এইচআইভি বা এইডসের বিরুদ্বে প্রতিরোধ কার্যক্রম। এইডস সম্পূর্ণ সুস্থ করার মতো কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি বা এর বিরুদ্বে কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। তাই এইডস প্রতিরোধে এখনো একমাত্র উপায় হলো এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। আর এ কাজটি করতে হলে জানতে হবে এইচআইভি ভাইরাস কীভাবে সংক্রমিত হয়। একজন আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে এই ভাইরাসটি যতক্ষণ সুস্থ কারো দেহে প্রবেশ না করছে ততক্ষণ সুস্থ কেউ আক্রান্ত হবে না। আর এটি সুস্থ দেহে সংক্রমিত হতে পারে বিভিন্ন উপায়ে। যেমনÑ আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হলে (কোনো প্রটেকশন ছাড়া); সংক্রমিত রোগীর রক্ত সুস্থ দেহে প্রয়োগ করলে; সংক্রমিত রোগীর ব্যবহার করা সিরিঞ্জ বা নিডল সুস্থ কেউ ব্যবহার করলে (বিশেষ করে নেশার কাজে এটি বেশি প্রয়োগ হয়ে থাকে); এমনকি সংক্রমিত গর্ভবতী মায়ের দেহ থেকে গর্ভের শিশু সংক্রমিত হতে পারে। কাজেই এসব ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
তার পরও যদি কেউ ব্যর্থ হন বা আশঙ্কা করেন যে, তিনি এইচআইভি সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন তবে তার উচিত কোনোরকম দ্বিধাহীন চিত্তে নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া। যদি পরীক্ষায় এইচআইভি সংক্রমণের ব্যাপারটি নিশ্চিত হয় তবে অবশ্যই চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ এখন চিকিৎসায় কিছুটা সাফল্য এসেছে। যেমন একজন আক্রান্ত রোগী প্রাথমিক অবস্থায় অর্থাৎ যখন দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়নি এমন অবস্থায় চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেলে এইডসের চূড়ান্ত উপসর্গগুলো দীর্ঘদিন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে এইচআইভি সংক্রমিত একজন রোগী বহু বছর কর্মজীবন উপভোগ করতে সমর্থ হবে, মানে সক্ষম জীবনযাপন করতে পারবে। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, একজন এইডস রোগীর সঙ্গে ওঠাবসা বা একই তোয়ালে শেয়ার করলে তার কাছ থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে এমনটি নয়। তাই সংক্রমিত হলেও সক্ষম হলে তার পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে বাধা নেই।
যত বিপদই আসুক, বিপদকে জয় করেই মানবসভ্যতাকে এগিয়ে যেতে হবে। মরণব্যাধি এইডসের প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী চলছে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ। প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস পালন করা হয়। আজ বিশ্ব এইডস দিবস। এবারের (২০১৭) প্রতিপাদ্য বিষয় বা সেøাগান Ñ ‘গু ঐবধষঃয, গু জরমযঃ’ অথবা বলা যায় স্বাস্থ্য আমার অধিকার। এই অধিকার কেবল চিকিৎসাপত্র বা মেডিসিনের প্রাপ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই অধিকার মানে হলো একজন অসুস্থ মানুষ তার বয়স, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান যাই থাকুক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সে সমান অধিকার ভোগ করবে। এখানে কোনোরকম তারতম্য বা ডিসক্রিমিনেশন করা যাবে না। সেই সঙ্গে থাকতে হবে স্যানিটেশন বা পয়ঃনিষ্কাশনের সুব্যবস্থা; স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান; স্বাস্থ্যকর কর্মস্থল; নিরাপদ খাবার ও পানীয়; সুন্দর ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশ। এ অধিকারগুলো নিশ্চিত করা না গেলে একজন ব্যক্তি তার নিজের স্বাস্থ্য যেমন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবেন, তেমনি এইডস প্রতিরোধেও ব্যর্থ হবেন। এ ব্যর্থতা প্রকট হয়ে দেখা দেবে তাদের ক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। যেমনÑ যৌনকর্মী, নেশাগ্রস্ত, অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচারে অভ্যস্ত, জেলখানার কয়েদি ও রিফিউজি।
বলা যায়, ২০৩০ সালের মধ্যে ০-সংক্রমণ, ০-ডিসক্রিমিনেশন এবং ০-মৃত্যু অর্জন করতে হলে অর্থাৎ এইচআইভি বা এইডসকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করতে হলে এইচআইভিকে প্রতিরোধ করার বিকল্প নেই। এইচআইভিকে প্রতিরোধ করতে হলে এইচআইভি কীভাবে ছড়ায়, কারা আক্রান্ত হয়, এইচআইভি থেকে নিজেকে কীভাবে মুক্ত রাখা যায়Ñ এ বিষয়গুলো সবাইকে জানতে হবে এবং সবাইকে যার যার অবস্থানে থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
ডা. মো. ছায়েদুল হক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

About arthonitee

Check Also

pain

“ব্যাথার রকম ভেদ”

ব্যাথা কোন রোগ নয় রোগের উপসর্গ মাত্র। আমারা যখন শরীরের কোথাও আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা রোগাক্রান্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *