প্রচ্ছদ / মতামত / ভাতের চালের সংকট!

ভাতের চালের সংকট!

bashar

 কাজী মোঃ খায়রুল বাসার: আমরা বাংলাদেশী বাংলা ভাষার মানুষ। মাছে ভাতে বাংগালী প্রবাদটি ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি এবং দেহের লালন ও মেধা শক্তি বৃদ্ধির জন্য তিন বেলা ভাত খেয়ে চলেছি। আমরা চলনবিলের মাছ ও আমন ধানের লাল চালের সাথে টাটকা সব্জির গন্ধ এই যান্বিএতক ঢাকা শহরে বাস করেও পাই। বর্তমান সময়ে কৃষিতে যুগউপযোগী পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের কৃষকের সেই উদ্বাস্তু, অসহায় ও বিপন্ন জীবনের তেমন কোন সময় উপযোগী রূপান্তর ঘটেনি।খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, চলনবিলের মানুষের ভাষায় ভাতের চালের সংকট দূর করতে হলে, কৃষিতে বাস্তব মূখী কৃষক উন্নয়ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান আধুনিক কৃষক কৃষি পণ্যে উৎপাদন করে বাণিজ্য দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে, যে কৃষি পণ্যে উৎপাদন করলে লাভ হবে, সেই কৃষি পণ্যেই তারা উৎপাদন করছে। আধুনিক কৃষক লাভ ও ক্ষতির হিসাব করছে। ধানের ন্যার্য মূল্য কৃষক না পেলে কৃষক ধান উৎপাদন করবে না, এটা সহজ সমীকরন।আধুনিক কৃষক লাভের আশায় কৃষি পণ্যে উৎপাদনে বৈচিএময় চাষের দিকে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা আরো ঝুকির মধ্যে পডবে। এছাড়া চলছে অতি বাণিজ্যকরন, একজন কৃষক যে দামে তার পণ্যে বিক্রয় করে, তার চেয়ে দ্বি-গুন তিন-গুন (ক্ষেএ বিশেষে ১০০গুনের বেশী) বেশী দামে সাধারন মানুষের এসকল পণ্যে ক্রয় করতে হচ্ছে। আধুনিক কৃষক এখন বলছে তারা কৃষি পণ্যের ন্যার্য মূল্য পায় না, অথচ মধ্য সত্বভোগীরা অধিক মুনাফা করছে। মোদ্দা কথা আধুনিক কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের উৎপাদন খরচের চাইতে কিছু লাভে তার পণ্য বিক্রয় করতে চায়। সেই নিশ্চিয়তা কৃষকদের দেওয়া না হলে সামনের দিন গুলিতে ভাতের চালের অভাব দেখা যাবে। আজ বিড়ি-সিগারেট কোম্পানিগুলো তাদের লাভের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ, বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ করে ক্ষতিকর তামাক চাষে কৃষকদের প্রলুব্ধ করতে পারছে, কারন বর্তমান তামাক চাষ লাভ জনক।এ বিষয়ে অনেকে মনে করেন, ধান উৎপাদন লাভ জনক করতে না পারলে, খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চিয়তা হুমকির মূখে পড়বে।তাই এখন সময় কৃষকদের উন্নয়ণে বাস্তবমূখী সুযোগ সুবিধা কৃষকের ঘরে পৌছিয়ে দেওয়া। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জামান, গবেষক ড. আসাদজ্জ্ামান বলেছিলেন কৃষক বাঁচাতে হলে ধানের ন্যার্য্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে । এখানে প্রধান উপলদ্ধি কৃষক বাঁচাতে হলে ধানের ন্যায মূল্য দিতে হবে। বর্তমান সময়ে ধান উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে এবং ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ কমছে।এখন সঠিক অতি কার্যকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে ধান চাষের জমির সংকট হবে। বাংলাদেশে মোট ভুমির পরিমান ৩ কোটি ৭৪ লাখ একর যার মধ্যে ৬০% কৃষি জমি। এক কোটি ৬০ লাখ একর জমি (৪৩%) ব্যক্তি মালিকানাধীন । প্রতি বছর কৃষি জমি কমছে ৭৭ হাজার ৭২ একর, অথাৎ প্রতিদিন ১৯৭ একর (তথ্য উৎস ঃ ড. আবুল বারকাত)। আবাদ যোগ্য জমি এদেশের মূল ও মৌলিক সস্পদ। প্রকৃত অর্থ হলো কৃষি জমি কমতে থাকা মানে ” খাদ্য নিরাপওা চেইন বাধা গ্রস্থ হওয়া ”। বর্তমান যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, তার সাথে সময় উপযোগী গানিতিক পদ্ধতি (সঠিক পরিকল্পনা ) অনুসরন না করে ব্যক্তি স্বার্থে যেখানে খুশি সেখানে শিল্পকারখানা, আবাসন, রাস্তা ইত্যাদি গড়ে উঠছে। বর্তমানে যে অনুপাতে আবাদ যোগ্য জমি কমছে, তাতে আগামী শতকে কৃষি কাজের জন্য কোন চাষের জমি থাকবে কিনা, এ নিয়ে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন।এই প্রবণতা সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিতকরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চলনবিলের এক চাচা বলেছিলেন কৃষকের জোট লারার (খড়ের তৈরি রশি) সোট। চাচার এই কথাটি বর্তমান সময়ের আধুনিক কৃষকগণ মিথ্যায় পরিণত করেছে।এখন বুঝতে হবে আধুনিক কৃষক ধান চাষে লাভ চায়, এটাই স্বভাবিক, লাভ না হলে কৃষক যে ফসলে লাভ আছে, সেই ফসল উৎপাদন করবে।ফলে ৩০ টাকার চাল ৬৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে।নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, দিন বদল একটি ভালো চিন্তা, দিন বদলের দরকার আছে। কিন্তু এখানে একটু, ওখানে একটু করে জোড়াতালি দিয়ে দিন বদল হবে না। এছাড়া চলমান বাজার ব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার আছে বলে মন্তব্য করেন। আমরা অধিকাংশই বাংলাদেশের গর্বিত কৃষকের সন্তান।বর্তমান আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রতি নিয়ত পরিবর্তন মূখী।কারণ জনসংখ্যা যে অনুপাতে বাড়ছে, উল্টাদিকে কৃষি জমি কমছে। আধুনিক কৃষিতে যে পরিমান রাসানিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে।তাতে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে, পানি দূষিত হচ্ছে, প্রাকৃতিক মাছে বিভিন্ন রোগ হচ্ছে, গবাদি পশুর খাদ্য পানীয়তে বিষক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। তবুও আশার আলো আছে, বাংলাদেশের কৃষিতে নিত্য নতুন কৃষি পণ্যে উৎপাদন পদ্ধিত আসছে। আধুনিক কৃষিকে আরো আধুনিক করতে হলে, সময় উপযোগী তথ্য ও কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের গতি বৃদ্ধি করতে হবে।
ধান উৎপাদনে প্রতিটি খাতে কি পরিমান খরচ বৃদ্ধি (উপকরণের ব্যবহার ও মূল্য বৃদ্ধি) পেয়েছে তার কিছু বাস্তব তথ্য ( বোরো মৌসুমের ফসল, ধান উৎপাদনের খরচ প্রতি বিঘা/৩৩ শতাংশ জমিতে) উল্লেখ্য করা হলো ঃ
ধানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি:
ক) জমি চাষ:  ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ২১%-২৭% ।
খ) বীজ খরচ : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭%-৩৩% ।
গ) চারা রোপন: ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮%-২৪% ।
ঘ) কীটনাশক ব্যবহার : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ১০০%-১৫০% ।
ঙ) সেচ খরচ : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯%-২৫%।
চ) চুক্তি ভিক্তিক শ্রমিক : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫%-৩৩%।
ছ) ধান কাটা ও মাড়াই খরচ : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬%-৪০%।
জ) বিভিন্ন সার বাবদ খরচ : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ১০%-১৮%।
ঝ) অন্যান্য বাবদ খরচ* : ২০১৫ সালের চাইতে ২০১৬ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫%-২৩%।
প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ জমিতে) উৎপাদন খরচ ২০১৫ সাল থেকে ২০১৬ সালে কি হারে (%) বৃদ্ধি পেয়েছে তার চিএ নিন্মে দেখানো হলো ঃdhan

 
ভাতের চালের সংকট যাতে না হয় সেই জন্য প্রথমেই একটি গবেষণা ও জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন। তবে গবেষণার নামে এ যাবত ঃ যে গবেষণা হয়েছে ? সেই গবেষণা হলে হবে না, অপঃরড়হ ধর্মী গবেষণা করতে হবে।যার সাথে সরাসরি কৃষক জড়িত থাকবে।শুধু কাগজ কলমে সুন্দর রির্পোট দিয়ে গবেষণার মূল্যায়ণের দিন শেষ। আমরা নতুন দিনের স্বপ্ন সফলের সাহসী ত্যাগী সন্তান হতে চাই। সোনার এই দেশকে খাদ্য নিরাপওা বলয়কে শক্তি শালী করতে চাই।বাংলাদেশের মাঠ পর্যায় সকল কৃষক ও বিভিন্ন পেশাজীবি যারা গর্বিত কৃষকের সন্তান। তারা খুব ভাল করেই জানে কৃষিকে কি ভাবে এগিয়ে নিতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে বাংলাদেশের আজকের কৃষিকে কৃষক বান্ধব করে গড়ি তুলি।

 

গবেষক কাজী মো: খায়রুল বাসার
সদস্য, পাঠ্যক্রম কমিটি
গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর।

About arthonitee

Check Also

panna

ইসরায়েল-চীন-ভারত-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ

মঞ্জুরুল আলম পান্না: নির্যাতন আর মৃত্যূর বিভীষিকা থেকে নিজ ভিটে মাটি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *