প্রচ্ছদ / মতামত / পদ্মা সেতু অর্থনীতির জন্য বয়ে আনবে আশীর্বাদ

পদ্মা সেতু অর্থনীতির জন্য বয়ে আনবে আশীর্বাদ

salahuddin

ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ : স্বপ্নের পদ্মা সেতু অবশেষে ডানা মেলতে শুরু করেছে। গত শনিবার সকাল ১০টায় দুটি খুঁটির ওপর বসানো হয়েছে ১৫০ মিটার দীর্ঘ একটি স্প্যান।
জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৭৮ নম্বর খুঁটির ওপর ৩ হাজার টনেরও বেশি ওজনের স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তব রূপ নেওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান স্থাপনের মাধ্যমে স্বপ্নের এই সেতু বাস্তব রূপ নেবে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতু হবে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সেতু। প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে পদ্মা সেতুর দুটি বিশাল খুঁটির ওপর স্প্যান বসানোর কাজ দেখবেন এমনই কথা ছিল। অসুস্থতার কারণে বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় সেখান থেকেই নির্দেশ দেন সেতুর কোনো কাজ যেন এক মুহূর্তের জন্যও বসে না থাকে। এ নির্দেশনার পর শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় স্বপ্নের পদ্মা সেতুকে বাস্তবে রূপান্তরের কাজটি। স্মর্তব্য, পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি সম্পন্ন হয়েছে ৪৯ শতাংশ, নদীশাসনের কাজ হয়েছে ৩৪ শতাংশ, মাওয়া প্রান্তে অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ ১০০ শতাংশ, জাজিরা প্রান্তে অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ ৯৮ শতাংশ এবং সার্ভিস এরিয়া-২-এর কাজ হয়েছে ১০০ শতাংশ। সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্যান্য স্প্যানও ওঠানো শুরু হবে। এখন ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ৬টি খুঁটি বসানো সম্পন্ন হওয়ার পর্যায়ে। শিগগিরই শেষ হবে ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটির কাজ। ৩৮ নম্বর খুঁটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ ২ খুঁটি ধরে আরও ২টি স্প্যান বসবে।
গত বছরের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। নিজস্ব অর্থায়নে সেতু তৈরির সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে ওঠায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। ২০০১ সালের ৪ জুলাই এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরের আট বছরে এই সেতু নির্মাণে কোন অগ্রগতি হয়নি। ২০০৯ সালে আবারও সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি বাতিল করে। ২০১৩ সালের ৪ মে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয় সরকার। গত বছরের মার্চে শুরু হয় পাইলিং।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এ বছর ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে মূল সেতুর কাজে। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর মূল সেতুর ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৩৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্জিত হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৫ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ পরিদর্শন করার পর জানান, সেতু প্রকল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একটি স্প্যান পুরোপুরি তৈরি হয়েছে। আগামী মাসে তা স্থাপন করা হবে। আরও দুটি স্প্যান জোড়া দেয়ার কাজ চলছে।
স্প্যানের মাঝবরাবর নিচের লেনে চলবে ট্রেন। ওপরে কংক্রিটের চার লেনের সড়কে চলবে গাড়ি। যথাসময়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করাকে সরকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। প্রমত্ত পদ্মাকে শাসনে রাখা এবং পিলার বসানোর জটিল কাজ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলেছে সেই চ্যালেঞ্জ মনে রেখে। ব্যয়বহুল এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক ও রেলপথে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে উঠবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাড়ে ৩ কোটি মানুষের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির জন্য তা বয়ে আনবে আশীর্বাদ।
দক্ষিণাঞ্চলের তিন কোটি মানুষের জীবনে এত দিন যা ছিল শুধুই স্বপ্ন, তা আজ বাস্তবে ধরা দিয়েছে। বাংলাদেশ গর্বের সঙ্গে বলতে পারছে, ‘হ্যাঁ, আমরাও পারি। কারো সাহায্য ছাড়াই ছয় কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ পদ্মা সেতু আমরাও বানাতে পারি।’
পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। প্রথম বাজেটে ২৯০ কোটি ডলারের মধ্যে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু কোনো অর্থ ছাড় করার আগেই ২০১২ সালে হঠাৎ করেই ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ তুলে চুক্তি থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। বলা হয়, কানাডার এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার শর্তে ঘুষ নেওয়ার ব্যাপারে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তার ডায়েরিতে নাকি তেমন প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে কানাডার আদালতে একটি মামলা হয়। দেশটির পুলিশ প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালিয়ে সেই কর্মকর্তার ডায়েরিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করে। অনেক শুনানি করে ও কাগজপত্র দেখে কানাডার আদালত শেষ পর্যন্ত রায় দেন, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কষ্টকল্পিত। এদিকে বিশ্বব্যাংক চুক্তি স্থগিত করলেও অর্থায়নে ফিরে আসার জন্য তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীকে সরানোসহ একের পর এক শর্ত দিতে থাকে। শর্ত মানতে প্রথমে সরকার কিছু অনীহা দেখালেও পরে সেতু নির্মাণের স্বার্থে প্রায় সব শর্তই মেনে নেয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। অর্থায়নে তারা আর ফিরে আসেনি। বিশ্বব্যাংক যখন সেতু নিয়ে খেলছে, সে সময় বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যের পক্ষে দেশে নিরপেক্ষতার দাবিদার কয়েকটি পত্রিকা সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধে নামে, ক্রমাগত বিষোদ্গার করতে থাকে। এ অবস্থায় বছর দুয়েক পার করে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দেয়। নতুন করে টেন্ডার হয়। এর মধ্যে ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়। তখন সেসব পত্রিকা প্রচারে নামে নিজস্ব অর্থে সেতু নির্মাণ করতে গেলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্যের কোটায় চলে যাবে। দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। বাস্তবে সেসব কিছুই হয়নি। রিজার্ভ দিন দিন আরো বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, অতীতে রিজার্ভ যার ধারেকাছেও আসতে পারেনি। পদ্মা সেতুও আজ দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এসব ষড়যন্ত্র না হলে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে আজ হয়তো যানবাহন চলাচল করত। দেশের অর্থনীতিতে ২ থেকে ৩ শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যোগ হতো। তারা এ ক্ষতিটুকুই করেছে বাংলাদেশের।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে এভাবেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। বিদেশি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে দেশি ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের স্বাধীনতা পর্যন্ত বিকিয়ে দিয়েছে। এবার আমাদের উপলব্ধির পালা। সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে এগিয়ে যাওয়ার পালা। পদ্মা সেতু এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।

লেখক: ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ , অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী।

About arthonitee

Check Also

panna

ইসরায়েল-চীন-ভারত-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ

মঞ্জুরুল আলম পান্না: নির্যাতন আর মৃত্যূর বিভীষিকা থেকে নিজ ভিটে মাটি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *