প্রচ্ছদ / মতামত / ইসরায়েল-চীন-ভারত-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ

ইসরায়েল-চীন-ভারত-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ

panna

মঞ্জুরুল আলম পান্না: নির্যাতন আর মৃত্যূর বিভীষিকা থেকে নিজ ভিটে মাটি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে অনন্য এক মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাংলাদেশের নাম। কিন্তু সেই মানবিক রাষ্ট্রটি যে ভয়াবহ এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে সেই আশঙ্কা এরই মধ্যে অনেকের মনে জেগেছে। সেই ষড়যন্ত্রের জাল সম্ভবত রোহিঙ্গা ইস্যুকে ঘিরে বিস্তার ঘটতে যাচ্ছে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পর রাখাইনে বর্মী সেনাবাহিনী গত ২৫ সেপ্টেম্বর উদ্ধার করলো দুটি গণ কবর, যেখানে মিলেছে ২৮ টি লাশ। আর তার সব ক’টিই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের। নির্যাতনের শিকার হয়ে সেখান থেকে অনেক হিন্দুও দেশ ছেড়েছেন। তবে শুধুমাত্র হিন্দুদের লাশ খুঁজে বের করে তা ফলাও করে প্রচারের ঘটনায় সু চি’র সরকারের দুরভিসন্ধি বুঝতে খুব বেশী হিসেব নিকেশের দরকার হয় না।
মিয়ানমারের সেনা কর্তৃপক্ষ হিন্দুদের হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করছে রোহিঙ্গাদের মাঝ থেকে জন্ম নেয়া উগ্রবাদী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি-আরসা’কে। তবে সংগঠনটি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নাকচ করে বলছে, এটি মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের ‘মিথ্যাচার’। আরসা’র দাবি- ‘বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা হিন্দু-মুসলিম বিভেদ তৈরি করতে চাইছে। এজন্য তারা আরসা সদস্যদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’
আরসা’র কার্যক্রমকে সমর্থন করা না গেলেও ওই ঘটনা প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্যকে আমলে নেয়ার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। হঠাৎ করে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের গণকবর আবিস্কার করে ঢাক ঢোল পিটিয়ে তা প্রচারের মাধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে নাটকের চূড়ান্ত রূপ দেয়া হতে চলেছে। মনে হচ্ছে, এখানে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ অনেক বেশী সক্রিয়।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোন এক অংশকে ব্যবহার করে টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের ওপর কোন একভাবে যদি আক্রমণ চালানো যায় তবে খুব সহজেই একটা যুক্তি হয়তো দাঁড় করানো যাবে যে, আরসা’কে মদদ দিচ্ছে বাংলাদেশ, যার পেছনে রয়েছে আইএস। ইরাক-আফগানিস্তানের পরবর্তী মিশন হিসেবে তবেই বাংলাদেশে মোক্ষম অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাবে মার্কিন-ইসরায়েল, তা হলো জঙ্গি তকমা।
বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের খবর অনেক দিন থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য বঙ্গপোসাগরে মার্কিন ঘাটি প্রতিষ্ঠার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত মহাসাগরে যে রাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় থাকবে, গোটা এশিয়া সে দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ভারত মহাসাগরকে ঘিরেই। এ অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত এই তিন শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে তা ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দানা বাঁধছে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনার। এ খেলায় চূড়ান্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন বাংলাদেশ সীমান্ত। তাই সে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের সহায়তায় ব্যবহার করতে চাইছে রোহিঙ্গা ইস্যুকে, যে কারণে মানবাধিকার লংঘনের কথা বললেও কার্যত যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রশ্নে তেমন কোনো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না।
এশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলটিতেও রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রায় সবটুকু বর্তমানে নিয়ন্ত্রন করছে ভারত এবং চীন। দেশ দুটির সঙ্গে ভৌগলিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ ভারত মহাসাগরের উপর নজরদারী করা সহজ বলে বাংলাদেশের সামরিক অবস্থানগত গুরুত্বও কম নয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। একারণে এদেশের ওপর ভারত-চীনের দৃষ্টি সব সময়ের জন্য সতর্ক।
ভারতের পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এবং পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তানে চীনের সামরিক নৌ বন্দর নির্মাণে নয়াদিল্লির মাথা ব্যথার বড় কারণ হয়ে পড়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনের সামরিক ও নৌবাহিনীর শক্তিশালী পদচারণা ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকেও ভাবিয়ে তুলেছে।
এদিকে তেল ও গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে আরাকান সীমান্তের গভীর সমুদ্রে। ধারণা করা হয় এর পরিমাণ ব্যাপক। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে পাইপ লাইনে গ্যাস নেয়া শুরু করেছে চীন। মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সিডিউ বন্দর থেকে চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত পাইপ লাইন বসিয়ে তেল ও গ্যাস নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে। এতে করে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে আমদানি করা তেল ও গ্যাস দেশটির অভ্যন্তরে পৌঁছাতে এক সপ্তাহ সময় কম লাগবে।
ভারতও মিয়ানমারের সম্পদের নব্য অংশীদার হতে চায়। ওঁৎ পেতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে চায় মার্কিন কোম্পানিগুলো। রাশিয়ারও স্বার্থ সেখানে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা। সে চায় আণবিক শক্তি ও সামরিক সরঞ্জামাদি রপ্তানি করতে। রাশিয়া ও ভারত দুই দেশই ব্যস্ত মিয়ানমারে চীনের প্রভাব কমিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে। মিয়ানমার এখন তাই যুদ্ধবাজ এবং পুঁজিবাদী দেশগুলোর সবার আপন।
ভারত, চীনতো শুরু থেকেই তাদের নির্লজ্জ অবস্থান অং সান সু চি’র কথিত নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটির প্রতি দিয়েই রেখেছে। এমনকী নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকেও জাতিসংঘ কর্তৃক জাতিগত নিধনের অভিযোগে অভিযুক্ত মিয়ানমারের বিরূদ্ধে শক্ত অবস্থানের বিপক্ষে মত দিয়েছে রাশিয়া-চীন। আবার মার্কিন নীতি নির্ধারকরাও মনে করেন, চীনের বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য জোট গড়ে তুলতে হলে ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমারকেও প্রয়োজন। এর সব কিছুর পেছনেই রয়েছে পুঁজির ভয়ঙ্কর খেলা।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসরাইলের লাভ কী? উত্তরটা অনেকেরই জানা। দেশে দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখে নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই হচ্ছে বিশ্বের অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য। সেক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র নির্মানকারী দেশ হলো ইসরাইল। আইএসের সঙ্গে মোসাদের সম্পর্কের বিষয়টিও নতুন কিছু নয়।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস যে মোসাদের সৃষ্টি তা এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট, যেমনটা এখন সবার কাছে পরিস্কার লাদেনের আল কায়দার জন্ম ছিলো মোসাদ এবং সিআইএ’র হাতে। একথাও শোনা যায়, আইএস’এর শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে মোসাদের কাছ থেকে। মোসাদের নিজস্ব প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতেই আইএস জঙ্গিদের ‘যুদ্ধকৌশল’ শেখানো হয়।
‘মিডল ইস্ট আই’ নামের এক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রোহিঙ্গা নিধন করতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্র জোগান দিচ্ছে ইসরায়েল। ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি ট্যাঙ্ক, গানবোট, মিসাইল-সহ অন্যান্য মারণাস্ত্র মিয়ানমার সেনাকে দিয়েছে ইসরায়েল। ওই অস্ত্রের জোরেই রাখাইনে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর আপামর মানুষের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে সরকারি বাহিনী। এছাড়া ইসরাইলের ‘টার আইডিয়েল কনসেপ্টস’-সহ অস্ত্রনির্মাণকারী একাধিক সংস্থা বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মিয়ানমারের কমান্ডোদের।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে তেল আবিব। রাখাইন প্রদেশে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এরই মধ্যে। তবে থেমে নেই ইসরায়েল। সে তার কাজ করে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক কোন বিধি নিষেধের তোয়াক্কা না করে।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ-এর মতে, ‘আইএস ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী অস্ত্র। বিশ্বব্যাপী নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য এ ভয়ানক সাপকে মাঠে নামিয়েছে তারা।’ এই মুহূর্তে তারা তেমনই এক উর্বর মাঠ মনে করছে বাংলাদেশকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আইএস বিরোধী জোট সিরিয়া ও ইরাকে যুদ্ধ করছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সহযোগী ইসরায়েল তাতে অংশ নিচ্ছে না। কারণ স্পষ্ট।
অনেকেই মনে করেন, ভারত মহাসাগরীয় জিও পলিটিক্সে চীনের বিরুদ্ধে সরাররি কোন জোটে জড়াবে না ভারত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক বোমা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক কার্যকলাপ নিশ্চয় শুধুমাত্র পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে নয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর নিয়ে চীনের আগ্রহের কারণে এখন রীতিমতো আতঙ্কে ভারত।
মনে থাকার কথা, চীনকে মাথায় রেখেই ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন চালানোর আগেই ভারত আগ বাড়িয়ে তার নিজের ভূ-খণ্ড ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিলো বুশ প্রশাসনকে। ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বন্ধু। তবে আঞ্চলিক নেতৃত্বে ভারত নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে কতোটুকু ছাড় দেবে, সেই পরিকল্পনাও নিশ্চয় রয়েছে রাষ্ট্রটির।
অনেক হিসেব, অনেক খেলা, শত্রু মিত্রের যোগ বিয়োগ। বাংলাদেশ শুধু খেলার মাঠ। তার বন্ধু বলে কেউ নেই। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুর সুষ্ঠু সমাধানে সেই চেনা শত্রুদেরকে পাশে রাখতে অব্যাহত কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প বলতেও বাংলাদেশের সামনে কিছু নেই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু স্বার্থের জন্য অনেককেই অনেক কিছু দিয়েছে বাংলাদেশ। সেটা ছিলো মারাত্মক ভুল।
মিয়ানমার যেমন বড় বড় শক্তিগুলোর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশকেও তার নিজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। আন্তর্জাতিক অন্যান্য সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়াকে আস্থায় আনতে হবে। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে কেবল নয়, রাখাইনে লুটেরা সরকারী বাহিনীর নির্যাতন বন্ধেও বাংলাদেশকেই উদ্যোগী ভূমিকা নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সোচ্চার রাখতে হবে।
কারণ এতো কিছুর পরও থামেনি মিয়ানমারের নির্দয় সেনারা। এখনও অসহায় রোহিঙ্গাদের ঢল নামছে বাংলাদেশের বুকে।
সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশকে নিয়ে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের গন্ধ এখন সবার কাছে তীব্র মনে হলেও এদেশের শাসক গোষ্ঠি নিজ নিজ স্বার্থে মগ্ন থাকায় তাদের নাকে সে গন্ধ যাচ্ছে না। এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের, সীমাহীন লজ্জার।
মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
monjurpanna777@gmail.com

About arthonitee

Check Also

salahuddin

পদ্মা সেতু অর্থনীতির জন্য বয়ে আনবে আশীর্বাদ

ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ : স্বপ্নের পদ্মা সেতু অবশেষে ডানা মেলতে শুরু করেছে। গত শনিবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *