প্রচ্ছদ / মতামত / স্পেনের মোড়ক থেকে বেরিয়ে অাসতে মরিয়া কাতালুনিয়া

স্পেনের মোড়ক থেকে বেরিয়ে অাসতে মরিয়া কাতালুনিয়া

মোঃ মোর্তুজা মিশু:

ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। শাসনব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী দেশটি একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। এটি ইবেরীয় উপদ্বীপের প্রায় ৮৫% এলাকা জুড়ে অবস্থিত। স্পেনের আয়তন ৫,০৫,৯৯০ কি.মি যা আয়তনের বিচারে ইউরোপের ৪র্থ বৃহত্তম এবং দক্ষিণ ইউরোপের বৃহত্তম দেশ। মাদ্রিদ স্পেনের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। বার্সেলোনা, বালেন্সিয়া, সেবিইয়া, বিলবাও এবং মালাগা সহ অনেক বিখ্যাত শহর রয়েছে এই স্পেনে।স্পেনে স্পেনীয় ভাষা ছাড়াও প্রদেশভেদে আরও ৪টি ভাষাকে সহসরকারী ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; এগুলি হল কাতালান, গালিসীয়, বাস্ক এবং অক্সিতঁ ভাষাসমূহ।

কাতালোনিয়া অঞ্চলের ইতিহাস প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো। কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা। এই অঞ্চলের ছিলো নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পার্লামেন্ট, জাতীয় পতাকা ও সংগীত। কাতালোনিয়ায় নিজস্ব পুলিশ বাহিনী আছে। স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এই কাতালোনিয়ায়। স্পেনের উত্তর-পূর্বের এই প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা। বার্সেলোনা বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় শহরগুলোর একটি, ফুটবল এবং একই সাথে পর্যটনের কারণে। পর্যটন, টেক্সটাইল, ক্লাব, রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায় অনেকটা সমৃদ্ধ এই কাতালুনিয়া। এটি চারটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত বার্সেলোনা, গিরোনা, লেইদা এবং তারাগোনা। এর রাজধানী এবং সর্ববৃহত্‍ শহর বার্সেলোনা, যা মাদ্রিদের পর স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কাতালোনিয়ার আয়তন ৩২,১১৪ বর্গ কিলোমিটার এবং এর জনসংখ্যা ৭,৫৩৫,২৫১। ।

স্পেনের গৃহ যুদ্ধের অাগে এখানে ছিলো বড় রকমের স্বায়ত্তশাসন।১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনকে নানা ভাবে খর্ব করা হয়। কিন্তু ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর সেখানকার জাতীয়তাবাদ আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে। এবং তীব্র আন্দোলন ও দাবির মুখে ঐ অঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর সেটা করা হয় ১৯৭৮ সালের সংবিধানের আওতায়। স্পেনের সংসদে ২০০৬ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যেখানে কাতালোনিয়াকে আরো কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়। কিন্তু সংবিধানে কাতালোনিয়াকে দেওয়া এরকম অনেক ক্ষমতা পরে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত বাতিল করে দেয় যা কাতালোনিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিক-ভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন করে। জনরায় ছিলো- কাতালোনিয়া চায় স্বাধীনতা। কিন্তু সেটা ছিলো অনানুষ্ঠানিক এক গণভোট। বিচ্ছিনতাবাধীদের অাদিপত্যের কারনে সেখান দিনে দিনে অাম জনতা বিদ্রহী হয়ে উঠে। স্বায়ত্বশাসীত কাতালুনিয়ার ক্ষমতায় অাবির্ভাব ঘটে প্রেসিডেন্ট পুজেমন্ড এর অার কেন্দ্রীয় স্পেন সরকারের প্রধান প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়। এরই মাজে কাতালুনিয়া তাদের নিজস্ব সংসদে স্বাধীনতার প্রশ্নে ভোট করে যার পক্ষে ৭০ টি ও বিপক্ষে পড়ে ১০ টি ভোট। এরই মধ্য প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয় কাতালুনিয়ার পুলিশ প্রধান কে বরখাস্ত সহ প্রশাসনিক অনেক ক্ষমতা খর্ব করে।এর আগে কাতালান প্রেসিডেন্ট পুজডেমন ঘোষণা করেছিলেন, অন্য কোন আদালত বা রাজনৈতিক শক্তি তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে বরখাস্ত করতে পারবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী রাহয় বলেন, “কাতালোনিয়ায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্যে সেখানে প্রত্যক্ষ শাসন জারি করা জরুরী হয়ে পড়েছে।”এরই মাঝে চলতে থাকে অান্দোলন, বিক্ষোভ। এরই মাঝে ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে প্রায় ১০ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। স্পেন সরকারের বিরোধিতা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কাতালুনিয়ার মানুষ গত ১ অক্টোবর ২০১৭ যে গণভোটে অংশ নেয়, সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট কাতালুনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে পড়ে বলে কাতালান সরকারের ভাষ্য। কিন্তু কেন্দ্রীয় সকরার তাদের এই ভোট কে বৈধতা দেয়নি কারন তাদের দাবি এই ভোট্ মাত্র ৪৩ শতাংশ ভোটার অংশ নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার মারিয়ানো রাহয় এর এই ধরনের সিদ্ধান্তে অারো বিদ্রোহী করে কাতালানদের। এরই মধ্যে ২০১৭ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনকালে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় জড়িত থাকার দায়ে শীর্ষ ৯ জনকে ৯-১১ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। এসবকিছুকে ঘিরে কাতালানদের বেশিরভাগ লোক অান্দোলনে নেমে পড়ে। যার কারনে কেন্দ্রীয় সরকার ১৫৫ ধারা জারি করে। অর্থাৎ ১৫৫ ধারা মতে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারি শাসন অারোপ করতে পারবে।দীর্ঘপথ পরিক্রমায় থেমে নেই কাতালানরা। ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা ও স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব দরবারে স্বাধীনতাকামী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। স্পেনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই পরিস্থিতি কে ভিন্নভাবে প্রভাহিত করার চেষ্টা করছেন। নভেম্বরে হতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন। তাই প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ডানপন্থীদের চাপে অাছেন। গতো একসপ্তাহ ধরে তাই কাতালনরা অাবার রাস্তায় অান্দোলনে অবস্থান করছে।

কাতলান নাকি স্পেন কে জয়ী হবে? অাসলে এমন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বা দেওয়া দুষ্কর। তবে শিল্পসমৃদ্ধ কাতালুনিয়া থেমে নেই। ফুটবল ক্লাব বাসেলোনাও স্বাধীনতার প্রশ্নে স্বোচ্চার অবস্থানে।সব সূচকে এগিয়ে থাকা কাতালনরা হয়তো একদিন তাদের স্বাধীনতা পাবে। কারন হিসেবে বলতে পারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রশাসনীক ক্ষমতা৷ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপ অনৈতিক তথা হটকারী কিছু মানবে বলে মনে হয় না। তবে কাতলনরা স্বাধীনতা পেলে অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়ে যাবে স্পেন কারন তাদের জিডিপির ১৯ শতাংশ অাসে কাতালুনিয়া থেকে। তাই জয় পরাজয়ের হিসেবে এগিয়ে রাখলাম কাতালানদের তবে হয়তো যন্ত্রণা পোহাতে হবে অারো কিছু মাস বা বছর।

(মোঃ মোর্তুজা মিশু: ব্যাংকার ও লেখক)

About akdesk1

Check Also

ছাত্রলীগের মাঝে এটা কোন ছাত্রলীগ?

হৃদয় তালুকদার: বাংলাদেশ ছাত্রলীগ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাত্র সংগঠন।১৯৪৮ সালের ৪ ঠা জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর …